CKEditor 5 Sample
ঢাকা ২১ মে, ২০২৬

মাসুদ সাঈদীর ইস্তানবুল প্রকল্পে বিনিয়োগের টাকা গেলো কোথায়?

#
news image

সমুদ্রসৈকত ঘিরে বিলাসবহুল পাঁচতারকা হোটেলের স্বপ্ন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। কুয়াকাটাকে কেন্দ্র করে নির্মাণাধীন ‘ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেড’ নামের এই প্রকল্পে বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে লাভজনক ব্যবসা, জমির মালিকানা, বার্ষিক মুনাফা এবং বিনামূল্যে হোটেলে থাকার নানা প্রতিশ্রুতি। তবে বাস্তবে প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। বিশাল কর্মযজ্ঞের ঘোষণা থাকলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো বড় ধরনের নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে প্রকল্পটির আর্থিক লেনদেন, শেয়ার বিক্রি ও বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে নানা মহলে।

*এ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে এশিয়া পোস্ট। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে প্রকল্পের আর্থিক লেনদেন, বিনিয়োগ সংগ্রহ এবং অনুমোদনসংক্রান্ত নানা অসঙ্গতির তথ্য।*

প্রতিষ্ঠানটির প্রচারণায় বলা হচ্ছে, কুয়াকাটার সমুদ্রপাড়ের প্রায় ৩০ বিঘা জমির ওপর নির্মিত হবে অত্যাধুনিক পাঁচতারকা হোটেল। সেখানে থাকবে ১৭ তলা দুটি টাওয়ার, যার নাম ‘সানরাইজ’ ও ‘সানসেট’। পাশাপাশি নির্মাণ করা হবে কটেজ, ভিলা, সুইমিংপুল, রেস্টুরেন্ট, জিমনেশিয়াম, পার্কিং জোন, বোটিং ব্যবস্থা, খেলার মাঠ ও অন্যান্য পর্যটনসুবিধা। প্রকল্পের অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে।

বিনিয়োগকারীদের বলা হচ্ছে, তারা শুধু মুনাফাই পাবেন না, বরং হোটেল নির্মাণ শেষ হলে মালিকানার অংশীদারও হবেন। বছরে তিন দিন ও দুই রাত বিনামূল্যে হোটেলে থাকার সুবিধাও দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। এসব প্রতিশ্রুতিতে আকৃষ্ট হয়ে অন্তত ১০ হাজার মানুষ এই প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছেন বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। সর্বনিম্ন তিন লাখ টাকা বিনিয়োগ হিসাব করলে সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা।

তবে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, প্রকল্প এলাকায় এখনো উল্লেখযোগ্য কোনো অবকাঠামোগত কাজ শুরু হয়নি। জমির একপাশে সীমিত পরিসরে বাউন্ডারি দেয়াল নির্মাণ ছাড়া বড় কোনো উন্নয়নকাজ চোখে পড়েনি। স্থানীয়দের ভাষ্য, এখন পর্যন্ত যা কাজ হয়েছে তার ব্যয় ২০ লাখ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

'ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেডের' কোম্পানি রেজিষ্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান পিরোজপুর-১ আসনের (পিরোজপুর সদর, নাজিরপুর ও ইন্দুরকানী) সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগে তিনি ইন্দুরকানী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন।

২০ হাজার শেয়ারের এ কোম্পানির মালিকানায় আছেন আরও তিনজন। তারা হলেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডিএম এমদাদুল হক এবং পরিচালক মো. আবু তৈয়ব ও হাফিজুর রহমান। মালিকানায় থাকা এই চারজনের প্রত্যেকের নামে ৫ হাজার করে শেয়ার রয়েছে। অর্থাৎ তারা একেকজন কোম্পানির ২৫ শতাংশের মালিক।রয়েছেন পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী। তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন। কোম্পানির আরও তিন পরিচালক হলেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডিএম এমদাদুল হক, মো. আবু তৈয়ব ও হাফিজুর রহমান। চারজনের প্রত্যেকের নামে সমান সংখ্যক শেয়ার রয়েছে।

এদিকে ব্যাংক লেনদেনের তথ্য অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, বিনিয়োগ সংগ্রহের জন্য প্রতিষ্ঠানটি একাধিক ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করছে। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক, আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া ও শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকে একটি করে মোট চারটি এবং সিটি ব্যাংক ও প্রিমিয়ার ব্যাংকে দুটি করে আরও চারটি অ্যাকাউন্ট রয়েছে। পাশাপাশি বিকাশ ও নগদের মতো মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমেও বিনিয়োগ সংগ্রহ করা হয়। এ ছাড়া নগদ টাকায় বিনিয়োগ করার সুযোগ রয়েছে। এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে ইস্তানবুলের আটটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে সাতটির তথ্য মিলেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, গত সপ্তাহ পর্যন্ত ইস্তানবুলের সাতটি ব্যাংক হিসাবে জমা হয়েছে মোট ১৯০ কোটি টাকা। তবে সর্বশেষ স্থিতি (ব্যালেন্স) রয়েছে মাত্র ১৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ বাকি ১৭৫ কোটি টাকা এরই মধ্যে তুলে ফেলা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে ইস্তানবুল হোটেল ও রিসোর্টের আট অ্যাকাউন্টের মধ্যে সাতটির বিস্তারিত তথ্য যাচাই করেছে এশিয়া পোস্ট। সেখানে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি টাকা জমা হয়েছে ইসলামী ব্যাংকের বনানী শাখার অ্যাকাউন্টে (অ্যাকাউন্ট নম্বরের শেষ সংখ্যা ১৮)। জমার পরিমাণ ৮২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এই অ্যাকাউন্ট থেকে তুলে ফেলা হয়েছে ৭৫ কোটি ৭৮ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। বর্তমানে রয়েছে ৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের গুলশান লিংক রোড শাখায় (অ্যাকাউন্ট নম্বরের শেষ সংখ্যা ৮৮) জমা হওয়া ১২ কোটি ৪৮ লাখ টাকার মধ্যে ১১ কোটি ৪৫ লাখ তুলে ফেলা পর এখন জমা রয়েছে ১ কোটি তিন লাখ টাকা। প্রিমিয়ার ব্যাংকের বংশাল শাখায় (অ্যাকাউন্ট নম্বরের শেষ সংখ্যা ৭৪) জমা হয়েছে ২৩ কোটি টাকা, তুলে নেওয়া হয়েছে ২২ কোটি ৫২ লাখ, জমা আছে ৪৮ লাখ টাকা। প্রিমিয়ার ব্যাংকের মহাখালী শাখায় (অ্যাকাউন্ট নম্বরের শেষ সংখ্যা ৩১) জমা পড়েছে ৩২ কোটি টাকা। ৩১ কোটি ২০ লাখ তুলে নেওয়ার পর এখন রয়েছে ৮০ লাখ টাকা। ব্যাংক এশিয়ার বনানী-১১ শাখায় (অ্যাকাউন্ট নম্বরের শেষ সংখ্যা ০৪) ২৩ কোটি ৮৩ লাখ জমা হওয়ার পর তুলে নেওয়া হয় ২৩ কোটি ৮২ লাখ। রয়েছে এক লাখ ৬৯ হাজার ৪১০ টাকা।

এ ছাড়া সিটি ব্যাংক বনানী শাখায় (অ্যাকাউন্ট নম্বরের শেষ সংখ্যা ৬৪) জমা হয় চার কোটি দুই লাখ টাকা। এখান থেকে কোনো টাকা তোলা হয়নি। অন্যদিকে সিটি ব্যাংক মতিঝিল শাখায় (অ্যাকাউন্ট নম্বরের শেষ সংখ্যা ৪১) জমা হয় ১৩ কোটি তিন লাখ টাকা। তুলে নেওয়া হয়েছে ৯ কোটি ৯২ লাখ। বর্তমানে রয়েছে তিন কোটি ১১ লাখ টাকা। এ ছাড়া শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক বনানী শাখায় একটি অ্যাকাউন্ট (অ্যাকাউন্ট নম্বরের শেষ সংখ্যা ১৪) রয়েছে ইস্তানবুল হোটেল রিসোর্টের নামে।

‘ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেডেএর বিক্রয় প্রতিনিধিরা দাবি করছেন, প্রকল্পে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে এবং হাজার হাজার শেয়ার বিক্রি হয়েছে। তবে বিভিন্ন কর্মকর্তার বক্তব্যে পাওয়া গেছে অসঙ্গতি। পরিচালক কাজী মিজানুর রহমান দাবি করেছেন, ইতোমধ্যে ২২ হাজার শেয়ার বিক্রি হয়েছে। প্রতি শেয়ারের গড় মূল্য তিন লাখ টাকা ধরলে বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৬৬০ কোটি টাকা। অন্যদিকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডিএম এমদাদুল হক বলেছেন, এখন পর্যন্ত ১০ হাজার প্যাকেজ বিক্রি হয়েছে এবং সংগ্রহ হতে পারে ৭০ থেকে ৮০ কোটি টাকা।

প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য পাঁচ ধরনের প্যাকেজ চালু করা হয়েছে। সাধারণ, ব্রোঞ্জ, সিলভার, গোল্ড ও প্লাটিনাম নামে এসব প্যাকেজে এক থেকে ২০টি পর্যন্ত শেয়ার দেওয়ার ঘোষণা রয়েছে। মোট ২৬ হাজার প্যাকেজ তৈরি করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে ২৫ বর্গফুট জমি ও স্থাপনার অংশীদারত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে।

চলতি মাসের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি শেয়ারের মূল্য কিস্তিতে চার লাখ টাকা হলেও এককালীন পরিশোধে ছাড় দিয়ে তিন লাখ ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। মাত্র ৫০ হাজার টাকা জমা দিয়েই বুকিং সম্পন্ন করার সুযোগ রাখা হয়েছে।

তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণ মানুষের কাছে এভাবে শেয়ার বিক্রি করতে হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন প্রয়োজন। প্রচলিত আইন অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠান যদি জনসাধারণের কাছ থেকে বিনিয়োগ আহ্বান করে, তাহলে তা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে করতে হয়। কিন্তু প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা এমন কোনো অনুমোদনের কাগজ দেখাতে পারেননি।

এ বিষয়ে কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট ড. এসএ অপু বলেন, জনসাধারণের কাছে শেয়ার বিক্রির জন্য একটি কোম্পানিকে নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। তার মতে, কোনো প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি প্রকাশ্যে সাধারণ মানুষের কাছে শেয়ার বিক্রি করতে পারে না। এ জন্য প্রতিষ্ঠানকে পাবলিক লিমিটেড হিসেবে নিবন্ধিত হতে হয় এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন প্রয়োজন।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি। অথচ প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির পক্ষে প্রকাশ্যে সাধারণ মানুষের কাছে শেয়ার বিক্রি করা আইনসম্মত নয় বলে জানিয়েছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে রাজনৈতিক পরিচয়ও ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের প্রচারপত্রে প্রয়াত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর নাম ও ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। চেয়ারম্যান মাসুদ সাঈদীর পরিচয়ের সঙ্গে তার রাজনৈতিক অবস্থানও উল্লেখ করা হয়েছে। বিক্রয় প্রতিনিধিদের কেউ কেউ বিনিয়োগকারীদের কাছে এটি একটি রাজনৈতিক দলের ঘনিষ্ঠদের প্রতিষ্ঠান বলেও প্রচার করেছেন।

তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পর্ক নেই। কেউ ব্যক্তিগতভাবে ব্যবসা করতে পারেন, তবে তার দায় দল নেবে না।

বিনিয়োগ সংগ্রহের ক্ষেত্রে বিক্রয়কর্মীদের বক্তব্যেও পাওয়া গেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। কয়েকজন বিক্রয় প্রতিনিধি স্বীকার করেছেন, অধিকাংশ বিনিয়োগকারী প্রকল্পের দলিল বা অনুমোদন যাচাই না করেই বিনিয়োগ করছেন। তারা মূলত বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করছেন।

প্রতিষ্ঠানটির অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার মিজানুর রহমান তুহিন বলেন, অনেক বিনিয়োগকারী শুধু চেয়ারম্যান মাসুদ সাঈদীর বক্তব্য শুনেই শেয়ার কিনছেন। কেউ দলিল দেখতে চাইলে তাদের বিভিন্নভাবে নিরুৎসাহিত করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

কয়েকজন বিনিয়োগকারীর বক্তব্যেও উঠে এসেছে একই চিত্র। ঢাকার বাসিন্দা আলমগীর হোসেন জানান, তিনি চেয়ারম্যান মাসুদ সাঈদীকে বিশ্বাস করে তিনটি শেয়ার কিনেছেন। পরে কয়েকশ বিনিয়োগকারীকে কুয়াকাটায় নিয়ে গিয়ে প্রকল্প এলাকা দেখানো হয়। সেখানে সাময়িকভাবে কিছু কাজও শুরু করা হয়। তবে এখনো প্রকল্পের অগ্রগতি খুব একটা দৃশ্যমান নয়।

যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী মুরশিদ আলম জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেখে তিনি আগ্রহী হয়েছিলেন। কিন্তু বিক্রয় প্রতিনিধিদের অসংলগ্ন বক্তব্য ও অতিরিক্ত সংখ্যক বিক্রয়কর্মী দেখে তার সন্দেহ হয়। পরে আর বিনিয়োগ করেননি।

প্রকল্প কর্তৃপক্ষ বলছে, ধাপে ধাপে পুরো নির্মাণকাজ সম্পন্ন হবে। প্রথম ধাপে মসজিদ, মোটেল ও সার্ভিস বিল্ডিং নির্মাণ করা হবে। পরে কটেজ ও মূল হোটেল টাওয়ার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পুরো প্রকল্প শেষ হতে ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে

অন্যদিকে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডিএম এমদাদুল হক। তিনি দাবি করেন, ব্যাংক হিসাব থেকে যে অর্থ তোলা হয়েছে তার একটি অংশ পুনরায় এফডিআর করা হয়েছে। তাই অনেকেই ভুলভাবে হিসাব করছেন।

চেয়ারম্যান মাসুদ সাঈদীও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, তথ্য যাচাইয়ে ভুল থাকতে পারে এবং দেশে ফিরে তিনি সব কাগজপত্র দেখিয়ে ব্যাখ্যা দেবেন। তার দাবি, ভুল তথ্যের ভিত্তিতে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে

তবে প্রকল্প এলাকা, ব্যাংক লেনদেন, শেয়ার বিক্রি ও অনুমোদনসংক্রান্ত নথি বিশ্লেষণ করে পুরো বিষয়টি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষের বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে ব্যাংক হিসাব থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ উত্তোলনের তথ্য সামনে আসার পর অনেকেই এখন প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন।

নিউজ ডেস্ক

২০ মে, ২০২৬,  1:28 PM

news image
সংগৃহীত

সমুদ্রসৈকত ঘিরে বিলাসবহুল পাঁচতারকা হোটেলের স্বপ্ন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। কুয়াকাটাকে কেন্দ্র করে নির্মাণাধীন ‘ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেড’ নামের এই প্রকল্পে বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে লাভজনক ব্যবসা, জমির মালিকানা, বার্ষিক মুনাফা এবং বিনামূল্যে হোটেলে থাকার নানা প্রতিশ্রুতি। তবে বাস্তবে প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। বিশাল কর্মযজ্ঞের ঘোষণা থাকলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো বড় ধরনের নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে প্রকল্পটির আর্থিক লেনদেন, শেয়ার বিক্রি ও বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে নানা মহলে।

*এ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে এশিয়া পোস্ট। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে প্রকল্পের আর্থিক লেনদেন, বিনিয়োগ সংগ্রহ এবং অনুমোদনসংক্রান্ত নানা অসঙ্গতির তথ্য।*

প্রতিষ্ঠানটির প্রচারণায় বলা হচ্ছে, কুয়াকাটার সমুদ্রপাড়ের প্রায় ৩০ বিঘা জমির ওপর নির্মিত হবে অত্যাধুনিক পাঁচতারকা হোটেল। সেখানে থাকবে ১৭ তলা দুটি টাওয়ার, যার নাম ‘সানরাইজ’ ও ‘সানসেট’। পাশাপাশি নির্মাণ করা হবে কটেজ, ভিলা, সুইমিংপুল, রেস্টুরেন্ট, জিমনেশিয়াম, পার্কিং জোন, বোটিং ব্যবস্থা, খেলার মাঠ ও অন্যান্য পর্যটনসুবিধা। প্রকল্পের অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে।

বিনিয়োগকারীদের বলা হচ্ছে, তারা শুধু মুনাফাই পাবেন না, বরং হোটেল নির্মাণ শেষ হলে মালিকানার অংশীদারও হবেন। বছরে তিন দিন ও দুই রাত বিনামূল্যে হোটেলে থাকার সুবিধাও দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। এসব প্রতিশ্রুতিতে আকৃষ্ট হয়ে অন্তত ১০ হাজার মানুষ এই প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছেন বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। সর্বনিম্ন তিন লাখ টাকা বিনিয়োগ হিসাব করলে সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা।

তবে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, প্রকল্প এলাকায় এখনো উল্লেখযোগ্য কোনো অবকাঠামোগত কাজ শুরু হয়নি। জমির একপাশে সীমিত পরিসরে বাউন্ডারি দেয়াল নির্মাণ ছাড়া বড় কোনো উন্নয়নকাজ চোখে পড়েনি। স্থানীয়দের ভাষ্য, এখন পর্যন্ত যা কাজ হয়েছে তার ব্যয় ২০ লাখ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

'ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেডের' কোম্পানি রেজিষ্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান পিরোজপুর-১ আসনের (পিরোজপুর সদর, নাজিরপুর ও ইন্দুরকানী) সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগে তিনি ইন্দুরকানী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন।

২০ হাজার শেয়ারের এ কোম্পানির মালিকানায় আছেন আরও তিনজন। তারা হলেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডিএম এমদাদুল হক এবং পরিচালক মো. আবু তৈয়ব ও হাফিজুর রহমান। মালিকানায় থাকা এই চারজনের প্রত্যেকের নামে ৫ হাজার করে শেয়ার রয়েছে। অর্থাৎ তারা একেকজন কোম্পানির ২৫ শতাংশের মালিক।রয়েছেন পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী। তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন। কোম্পানির আরও তিন পরিচালক হলেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডিএম এমদাদুল হক, মো. আবু তৈয়ব ও হাফিজুর রহমান। চারজনের প্রত্যেকের নামে সমান সংখ্যক শেয়ার রয়েছে।

এদিকে ব্যাংক লেনদেনের তথ্য অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, বিনিয়োগ সংগ্রহের জন্য প্রতিষ্ঠানটি একাধিক ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করছে। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক, আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া ও শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকে একটি করে মোট চারটি এবং সিটি ব্যাংক ও প্রিমিয়ার ব্যাংকে দুটি করে আরও চারটি অ্যাকাউন্ট রয়েছে। পাশাপাশি বিকাশ ও নগদের মতো মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমেও বিনিয়োগ সংগ্রহ করা হয়। এ ছাড়া নগদ টাকায় বিনিয়োগ করার সুযোগ রয়েছে। এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে ইস্তানবুলের আটটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে সাতটির তথ্য মিলেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, গত সপ্তাহ পর্যন্ত ইস্তানবুলের সাতটি ব্যাংক হিসাবে জমা হয়েছে মোট ১৯০ কোটি টাকা। তবে সর্বশেষ স্থিতি (ব্যালেন্স) রয়েছে মাত্র ১৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ বাকি ১৭৫ কোটি টাকা এরই মধ্যে তুলে ফেলা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে ইস্তানবুল হোটেল ও রিসোর্টের আট অ্যাকাউন্টের মধ্যে সাতটির বিস্তারিত তথ্য যাচাই করেছে এশিয়া পোস্ট। সেখানে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি টাকা জমা হয়েছে ইসলামী ব্যাংকের বনানী শাখার অ্যাকাউন্টে (অ্যাকাউন্ট নম্বরের শেষ সংখ্যা ১৮)। জমার পরিমাণ ৮২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এই অ্যাকাউন্ট থেকে তুলে ফেলা হয়েছে ৭৫ কোটি ৭৮ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। বর্তমানে রয়েছে ৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের গুলশান লিংক রোড শাখায় (অ্যাকাউন্ট নম্বরের শেষ সংখ্যা ৮৮) জমা হওয়া ১২ কোটি ৪৮ লাখ টাকার মধ্যে ১১ কোটি ৪৫ লাখ তুলে ফেলা পর এখন জমা রয়েছে ১ কোটি তিন লাখ টাকা। প্রিমিয়ার ব্যাংকের বংশাল শাখায় (অ্যাকাউন্ট নম্বরের শেষ সংখ্যা ৭৪) জমা হয়েছে ২৩ কোটি টাকা, তুলে নেওয়া হয়েছে ২২ কোটি ৫২ লাখ, জমা আছে ৪৮ লাখ টাকা। প্রিমিয়ার ব্যাংকের মহাখালী শাখায় (অ্যাকাউন্ট নম্বরের শেষ সংখ্যা ৩১) জমা পড়েছে ৩২ কোটি টাকা। ৩১ কোটি ২০ লাখ তুলে নেওয়ার পর এখন রয়েছে ৮০ লাখ টাকা। ব্যাংক এশিয়ার বনানী-১১ শাখায় (অ্যাকাউন্ট নম্বরের শেষ সংখ্যা ০৪) ২৩ কোটি ৮৩ লাখ জমা হওয়ার পর তুলে নেওয়া হয় ২৩ কোটি ৮২ লাখ। রয়েছে এক লাখ ৬৯ হাজার ৪১০ টাকা।

এ ছাড়া সিটি ব্যাংক বনানী শাখায় (অ্যাকাউন্ট নম্বরের শেষ সংখ্যা ৬৪) জমা হয় চার কোটি দুই লাখ টাকা। এখান থেকে কোনো টাকা তোলা হয়নি। অন্যদিকে সিটি ব্যাংক মতিঝিল শাখায় (অ্যাকাউন্ট নম্বরের শেষ সংখ্যা ৪১) জমা হয় ১৩ কোটি তিন লাখ টাকা। তুলে নেওয়া হয়েছে ৯ কোটি ৯২ লাখ। বর্তমানে রয়েছে তিন কোটি ১১ লাখ টাকা। এ ছাড়া শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক বনানী শাখায় একটি অ্যাকাউন্ট (অ্যাকাউন্ট নম্বরের শেষ সংখ্যা ১৪) রয়েছে ইস্তানবুল হোটেল রিসোর্টের নামে।

‘ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেডেএর বিক্রয় প্রতিনিধিরা দাবি করছেন, প্রকল্পে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে এবং হাজার হাজার শেয়ার বিক্রি হয়েছে। তবে বিভিন্ন কর্মকর্তার বক্তব্যে পাওয়া গেছে অসঙ্গতি। পরিচালক কাজী মিজানুর রহমান দাবি করেছেন, ইতোমধ্যে ২২ হাজার শেয়ার বিক্রি হয়েছে। প্রতি শেয়ারের গড় মূল্য তিন লাখ টাকা ধরলে বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৬৬০ কোটি টাকা। অন্যদিকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডিএম এমদাদুল হক বলেছেন, এখন পর্যন্ত ১০ হাজার প্যাকেজ বিক্রি হয়েছে এবং সংগ্রহ হতে পারে ৭০ থেকে ৮০ কোটি টাকা।

প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য পাঁচ ধরনের প্যাকেজ চালু করা হয়েছে। সাধারণ, ব্রোঞ্জ, সিলভার, গোল্ড ও প্লাটিনাম নামে এসব প্যাকেজে এক থেকে ২০টি পর্যন্ত শেয়ার দেওয়ার ঘোষণা রয়েছে। মোট ২৬ হাজার প্যাকেজ তৈরি করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে ২৫ বর্গফুট জমি ও স্থাপনার অংশীদারত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে।

চলতি মাসের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি শেয়ারের মূল্য কিস্তিতে চার লাখ টাকা হলেও এককালীন পরিশোধে ছাড় দিয়ে তিন লাখ ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। মাত্র ৫০ হাজার টাকা জমা দিয়েই বুকিং সম্পন্ন করার সুযোগ রাখা হয়েছে।

তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণ মানুষের কাছে এভাবে শেয়ার বিক্রি করতে হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন প্রয়োজন। প্রচলিত আইন অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠান যদি জনসাধারণের কাছ থেকে বিনিয়োগ আহ্বান করে, তাহলে তা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে করতে হয়। কিন্তু প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা এমন কোনো অনুমোদনের কাগজ দেখাতে পারেননি।

এ বিষয়ে কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট ড. এসএ অপু বলেন, জনসাধারণের কাছে শেয়ার বিক্রির জন্য একটি কোম্পানিকে নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। তার মতে, কোনো প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি প্রকাশ্যে সাধারণ মানুষের কাছে শেয়ার বিক্রি করতে পারে না। এ জন্য প্রতিষ্ঠানকে পাবলিক লিমিটেড হিসেবে নিবন্ধিত হতে হয় এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন প্রয়োজন।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি। অথচ প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির পক্ষে প্রকাশ্যে সাধারণ মানুষের কাছে শেয়ার বিক্রি করা আইনসম্মত নয় বলে জানিয়েছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে রাজনৈতিক পরিচয়ও ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের প্রচারপত্রে প্রয়াত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর নাম ও ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। চেয়ারম্যান মাসুদ সাঈদীর পরিচয়ের সঙ্গে তার রাজনৈতিক অবস্থানও উল্লেখ করা হয়েছে। বিক্রয় প্রতিনিধিদের কেউ কেউ বিনিয়োগকারীদের কাছে এটি একটি রাজনৈতিক দলের ঘনিষ্ঠদের প্রতিষ্ঠান বলেও প্রচার করেছেন।

তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পর্ক নেই। কেউ ব্যক্তিগতভাবে ব্যবসা করতে পারেন, তবে তার দায় দল নেবে না।

বিনিয়োগ সংগ্রহের ক্ষেত্রে বিক্রয়কর্মীদের বক্তব্যেও পাওয়া গেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। কয়েকজন বিক্রয় প্রতিনিধি স্বীকার করেছেন, অধিকাংশ বিনিয়োগকারী প্রকল্পের দলিল বা অনুমোদন যাচাই না করেই বিনিয়োগ করছেন। তারা মূলত বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করছেন।

প্রতিষ্ঠানটির অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার মিজানুর রহমান তুহিন বলেন, অনেক বিনিয়োগকারী শুধু চেয়ারম্যান মাসুদ সাঈদীর বক্তব্য শুনেই শেয়ার কিনছেন। কেউ দলিল দেখতে চাইলে তাদের বিভিন্নভাবে নিরুৎসাহিত করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

কয়েকজন বিনিয়োগকারীর বক্তব্যেও উঠে এসেছে একই চিত্র। ঢাকার বাসিন্দা আলমগীর হোসেন জানান, তিনি চেয়ারম্যান মাসুদ সাঈদীকে বিশ্বাস করে তিনটি শেয়ার কিনেছেন। পরে কয়েকশ বিনিয়োগকারীকে কুয়াকাটায় নিয়ে গিয়ে প্রকল্প এলাকা দেখানো হয়। সেখানে সাময়িকভাবে কিছু কাজও শুরু করা হয়। তবে এখনো প্রকল্পের অগ্রগতি খুব একটা দৃশ্যমান নয়।

যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী মুরশিদ আলম জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেখে তিনি আগ্রহী হয়েছিলেন। কিন্তু বিক্রয় প্রতিনিধিদের অসংলগ্ন বক্তব্য ও অতিরিক্ত সংখ্যক বিক্রয়কর্মী দেখে তার সন্দেহ হয়। পরে আর বিনিয়োগ করেননি।

প্রকল্প কর্তৃপক্ষ বলছে, ধাপে ধাপে পুরো নির্মাণকাজ সম্পন্ন হবে। প্রথম ধাপে মসজিদ, মোটেল ও সার্ভিস বিল্ডিং নির্মাণ করা হবে। পরে কটেজ ও মূল হোটেল টাওয়ার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পুরো প্রকল্প শেষ হতে ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে

অন্যদিকে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডিএম এমদাদুল হক। তিনি দাবি করেন, ব্যাংক হিসাব থেকে যে অর্থ তোলা হয়েছে তার একটি অংশ পুনরায় এফডিআর করা হয়েছে। তাই অনেকেই ভুলভাবে হিসাব করছেন।

চেয়ারম্যান মাসুদ সাঈদীও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, তথ্য যাচাইয়ে ভুল থাকতে পারে এবং দেশে ফিরে তিনি সব কাগজপত্র দেখিয়ে ব্যাখ্যা দেবেন। তার দাবি, ভুল তথ্যের ভিত্তিতে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে

তবে প্রকল্প এলাকা, ব্যাংক লেনদেন, শেয়ার বিক্রি ও অনুমোদনসংক্রান্ত নথি বিশ্লেষণ করে পুরো বিষয়টি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষের বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে ব্যাংক হিসাব থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ উত্তোলনের তথ্য সামনে আসার পর অনেকেই এখন প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন।