ডক্টর রাধেশ্যাম সরকার
২৫ অক্টোবর, ২০২৫, 3:46 PM
ঢাকার আকাশরেখায় নতুন এক দৃশ্যপট তৈরি করেছে মেট্রোরেল। একসময় যেখানে যানজটে নাকাল নগরবাসীর দিন কাটত ঘণ্টার পর ঘণ্টা, আজ সেখানে সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছানো আর স্বপ্ন নয়, বাস্তব। মেট্রোরেল শুধু একটি যানবাহন নয়, এটি বাংলাদেশের নগরজীবনে আধুনিকতার প্রতীক, সময়ের প্রতি শ্রদ্ধা, আর নাগরিক সংস্কৃতির এক নবযাত্রা। ২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর উদ্বোধনের পর থেকে অল্প সময়েই এটি হয়ে উঠেছে ঢাকার মানুষের প্রতিদিনের নির্ভরতার নাম।
মেট্রোরেল শুধু যানবাহন নয়, এটি নগরজীবনের মানসিক পরিবর্তনের প্রতীক; যা মানুষকে, সময়কে মূল্য দেওয়ার শিক্ষা দেয়। ঢাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে যানজটের সঙ্গে বসবাসে অভ্যস্ত ছিল। অফিসে যাওয়ার আগে রাস্তায় আটকে থাকা যেন এক ‘নিত্যকার অনুশোচনা’। কিন্তু মেট্রোরেলের আগমন এই অভ্যাস ভেঙে দিয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ট্রেন আসে, নির্দিষ্ট সময়েই ছাড়ে এক মিনিট দেরি নেই। এই সময়নিষ্ঠ যাত্রা ঢাকাবাসীর মানসিকতায় এক নতুন ভাবনা জাগিয়েছে, তা যেন সময়ই সম্পদ। মেট্রোরেল চালুর আগে উত্তরা থেকে মতিঝিল যেতে যেখানে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগত, এখন সেই পথ মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ মিনিটে অতিক্রম করা সম্ভব। এখন কর্মজীবী মানুষ জানে, সকাল ৮টা ১৫-র ট্রেন ধরলে ৮টা ৩৫-এ অফিসে পৌঁছানো সম্ভব। এ যেন সময় ব্যবস্থাপনার এক নতুন পাঠ। দৈনন্দিন জীবনের এই ছোট পরিবর্তনই মানুষের চিন্তা, কাজ ও জীবনধারায় বড় প্রভাব ফেলছে।
মেট্রোরেল ঢাকাবাসীকে শৃঙ্খলার পথে নতুন নাগরিক অভ্যাস শেখাচ্ছে। মেট্রোরেলে উঠতে হলে লাইনে দাঁড়াতে হয়, টিকিট কিনতে হয় সঠিক নিয়মে, এবং প্রতিটি যাত্রা শুরু হয় পরিচ্ছন্ন স্টেশনের ভিতর দিয়ে। বাংলাদেশের সাধারণ গণপরিবহনে যেখানে ঠেলাঠেলি, চিৎকার, অনিয়ম একসময়ে ‘স্বাভাবিক’ ছিল, সেখানে মেট্রোরেল তৈরি করেছে এক নতুন সংস্কৃতি। এখানে সবাই নিয়ম মেনে চলে, দরজা বন্ধ হলে কেউ আর জোর করে ওঠার চেষ্টা করে না, নামার সময় ‘এক্সিট’ চিহ্ন অনুসরণ করে। এই দৃশ্য একসময় ঢাকার রাস্তায় অকল্পনীয় ছিল। শিক্ষার্থীরা, চাকরিজীবী, এমনকি বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিকরাও এখন ধীরে ধীরে এই শৃঙ্খলার অভ্যস্ত হচ্ছেন। এ যেন এক ‘নাগরিক শৃঙ্খলা আন্দোলন’, যার নেতৃত্ব দিচ্ছে মেট্রোরেল।
মেট্রোরেল ঢাকাবাসীকে পরিচ্ছন্নতা ও সময়নিষ্ঠ জীবনের অনুশীলনে উদ্বুদ্ধ করছে। মেট্রোরেলের প্রতিটি স্টেশন নিখুঁতভাবে পরিচ্ছন্ন রাখা হয়, কোনো আবর্জনা নেই, দেয়ালে পোস্টার নেই, আর ট্রেনের ভেতরে কাগজ বা পানির বোতল ছুড়ে ফেলা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এই পরিবেশে যাত্রীরা নিজেরাও শিখছেন পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার সংস্কৃতি। ঢাকার রাস্তায় ধুলোবালিতে অভ্যস্ত মানুষ যখন প্রথম মেট্রোরেলে ওঠে, তখন সে নীরব, পরিপাটি, শান্ত। এক অন্য পৃথিবী দেখে। এটি শুধু শারীরিক পরিচ্ছন্নতা নয়; এক ধরনের মানসিক শুদ্ধতাও এনে দেয়। মানুষ শিখছে, আধুনিকতার মানে শুধু উন্নত প্রযুক্তি নয়, পরিচ্ছন্ন মন ও আচরণও তার অংশ।
মেট্রোরেল আজ ঢাকাবাসীর মানসিক ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এটি কেবল গতি এনেছে তা নয় পরিবর্তন করছে নাগরিক মানসিকতাও। যে মানুষ আগে নিয়ম ভাঙাকে ‘বুদ্ধি’ মনে করত, সে এখন নিয়ম মানতে গর্ব বোধ করে। যে অফিসে দেরিতে পৌঁছানো একসময়ে স্বাভাবিক ছিল, এখন সেখানে সময়মতো আসা প্রতিযোগিতার বিষয়। এই পরিবর্তনই নগরজীবনের সত্যিকারের নবযুগের সূচনা করেছে। মেট্রোরেল আমাদের শিখিয়েছে, সময়ের প্রতি শ্রদ্ধা, পরিশ্রমের প্রতি সম্মান এবং সহযাত্রীদের প্রতি সহনশীলতাই আধুনিকতার আসল চিহ্ন।
মেট্রোরেল ঢাকাবাসীর ভ্রমণপ্রবণতা ও নাগরিক বিনোদনের নতুন ধারা তৈরি করছে। এটি এখন শুধু যাতায়াত নয়, এক ধরনের ‘নগর অভিজ্ঞতা’। অনেক পরিবার, শিক্ষার্থী ও বিদেশি পর্যটক সপ্তাহান্তে শুধু মেট্রোরেলে চড়তে আসে, এ যেন আধুনিক ঢাকার এক বিনোদনভ্রমণ। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত এই যাত্রায় শহরের এক নতুন দৃশ্য দেখা যায় উচ্চ রেললাইন ধরে দ্রুতগামী ট্রেন, নিচে ছুটে চলা শহরের জীবন। এতে মানুষের মধ্যে ভ্রমণপ্রবণতা বাড়ছে, শহরের প্রতি ভালোবাসা বাড়ছে, আর একটি নতুন ‘নগর-গর্ব’ তৈরি হচ্ছে।
মেট্রোরেল ঢাকার অর্থনীতি ও উৎপাদনশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে। ডি এম টি সি এল (উগঞঈখ)-এর হালনাগাদ তথ্যমতে, বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৩.৫৪.০ লক্ষ মানুষ মেট্রোরেলে যাতায়াত করছেন। বিশেষ দিনে এই সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় ৪.৫ লক্ষেরও বেশি, যেমন ৬ আগস্ট ২০২৫ তারিখে রেকর্ড হয়েছিল ৪৫৬,৭৪৬ জন যাত্রী। এই বিপুল যাত্রীর ধারাবাহিকতা ঢাকার অর্থনীতিতে উৎপাদনশীলতার নতুন দিগন্ত খুলেছে। কর্মজীবীরা সময়মতো অফিসে পৌঁছাতে পারছেন, ফলে কর্মঘণ্টা বাড়ছে, কাজের দক্ষতা বাড়ছে। আয়ের দিক থেকেও এটি একটি বড় সাফল্য। বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের মে মাসে মেট্রোরেলের দৈনিক টিকিট বিক্রির আয় প্রায় ৬.৬৮ মিলিয়ন টাকা (৬৬.৮ লাখ)। এর ভিত্তিতে মার্চ–আগস্ট ২০২৫ পর্যন্ত মাসিক গড় আয় প্রায় ২০২১ কোটি টাকা, আর মোট ছয় মাসে আয় প্রায় ১২৫ কোটি টাকার কাছাকাছি। যদিও বিদ্যুৎ, রক্ষণাবেক্ষণ ও কর্মচারী ব্যয়ের কারণে প্রতিদিন প্রায় ৫৬ লক্ষ টাকা ঘাটতি থাকে, তবে যাত্রীসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই ঘাটতি দ্রুত কমছে। সরকারে সকল প্রকল্প লাভের জন্য নয়; কিছু কিছু প্রকল্প জনসাধারণের এমন উপকারে আসে, যা টাকা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। মেট্রোরেল এমনই একটি প্রকল্প। উগঞঈখ আশা করছে, ২০২৬ সাল নাগাদ প্রকল্পটি আর্থিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারবে।
মেট্রোরেল ঢাকাবাসীর প্রযুক্তি ও ডিজিটাল পেমেন্ট সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিচ্ছে। মেট্রোরেলের টিকিটিং সিস্টেম পুরোপুরি ডিজিটাল। ‘র্যাপিড পাস’ কার্ডের মাধ্যমে যাত্রীরা এখন সহজে ই-লেনদেন করতে পারেন। এই ব্যবস্থা শুধু সময় বাঁচাচ্ছে না, বরং নগদহীন অর্থনীতির পথে বাংলাদেশকে এক ধাপ এগিয়ে নিচ্ছে। অনেক যাত্রী প্রথমবার এই ই-পেমেন্ট ব্যবহার করছেন, এটি তাদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও ডিজিটাল আর্থিক সচেতনতা বাড়াচ্ছে। ভবিষ্যতে মেট্রোরেল কার্ডের মাধ্যমে বাস ও ট্রেন সেবাও একই সঙ্গে ব্যবহার করা যাবে, যা হবে “ঙহব ঈরঃু, ঙহব ঈধৎফ” ধারণার বাস্তবায়ন।
মেট্রোরেল ঢাকার পরিবেশবান্ধব নগর পরিবহনের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে। মেট্রোরেল সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা হওয়ায় এতে কোনো কার্বন নির্গমন হয় না। জ্বালানিচালিত বাস বা ব্যক্তিগত গাড়ির তুলনায় এটি পরিবেশে দূষণ প্রায় ৮০% কমায় (পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমান অনুযায়ী)। ঢাকায় বায়ুদূষণ কমাতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এছাড়া এটি যাত্রীপ্রতি জ্বালানি ব্যয়ও কমায়, ফলে অর্থনৈতিক দিক থেকেও এটি টেকসই। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশকে জলবায়ুবান্ধব উন্নয়নের পথে নিয়ে যাচ্ছে।
মেট্রোরেল ঢাকার নগর অর্থনীতি ও সময়ের রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করছে। চালুর পর শহরের বাণিজ্যিক এলাকাগুলোর গতি বেড়েছে। মতিঝিল, আগারগাঁও, উত্তরা ও বিজয় সরণি এলাকায় জমির মূল্য বেড়েছে ১৫–২০% পর্যন্ত। স্টেশন ঘিরে গড়ে উঠছে ক্ষুদ্র ব্যবসা, কফি শপ, স্টোর যা নগর অর্থনীতিকে চাঙা করছে। একই সঙ্গে সময় বাঁচানোর মাধ্যমে মানুষ জীবনের ভারসাম্য খুঁজে পাচ্ছে; পরিবারে সময় দিতে পারছে, মানসিক চাপ কমছে। এটাই আধুনিক নগরজীবনের লক্ষ্য, গতি ও শান্তির সহাবস্থান। মেট্রোরেল ঢাকার চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার বাস্তব চিত্রও উন্মোচন করছে। অবশ্যই, প্রকল্পটি এখনো উন্নয়নযাত্রায় রয়েছে। লাইন-৬ সম্পূর্ণ চালু হলেও, ভবিষ্যতে লাইন-১, ২ ও ৫ যুক্ত হলে পুরো ঢাকা মহানগরী যুক্ত হবে এক দ্রুতগামী নেটওয়ার্কে। তখন প্রতিদিন প্রায় ১০১২ লক্ষ মানুষ মেট্রোরেল ব্যবহার করবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। তবে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও সংযোগ সড়ক উন্নয়নে আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন। তবুও এটি স্পষ্ট যে, মেট্রোরেল একটি স্থায়ী পরিবর্তনের সূচনা করেছে, যা আগামী এক দশকে ঢাকাকে ভিন্ন রূপে গড়ে তুলবে।
মেট্রোরেল ঢাকার নবযুগের বাস্তব রূপ ফুটিয়ে তুলছে। মেট্রোরেল শুধু স্টিল, কংক্রিট বা ট্র্যাকের সমষ্টি নয় এটি এক মানসিক বিপ্লব। যে মানুষ সময় মানতে শিখেছে, শৃঙ্খলা রক্ষা করছে, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখছে সে আসলে এক নতুন সমাজের নাগরিক। এই নবযুগ শুধু প্রযুক্তির নয়, মানসিকতারও। মেট্রোরেলের প্রতিটি যাত্রা যেন আমাদের শেখায়, “সময় মানা মানেই উন্নয়ন, শৃঙ্খলা মানা মানেই সভ্যতা।” ঢাকার মেট্রোরেল বাংলাদেশের নগর ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়। এটি শুধু যানবাহন নয়, এটি এক সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ। যেখানে সময়ের মূল্য বোঝা, নিয়ম মানা, পরিচ্ছন্নতা ও প্রযুক্তির ব্যবহার মিলেমিশে তৈরি করছে এক আধুনিক নাগরিক সত্তা। মেট্রোরেলের শব্দ যখন শহরের আকাশে প্রতিধ্বনিত হয়, তখন মনে হয়, এটি কেবল একটি ট্রেনের গতি নয়, এটি এক জাতির অগ্রগতির ছন্দ। মেট্রোরেল তাই সত্যিই নগর জীবনের নবযুগের সূচনা।
লেখক: কৃষিবিদ, গবেষক ও কলামিষ্ট।
ডক্টর রাধেশ্যাম সরকার
২৫ অক্টোবর, ২০২৫, 3:46 PM
ঢাকার আকাশরেখায় নতুন এক দৃশ্যপট তৈরি করেছে মেট্রোরেল। একসময় যেখানে যানজটে নাকাল নগরবাসীর দিন কাটত ঘণ্টার পর ঘণ্টা, আজ সেখানে সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছানো আর স্বপ্ন নয়, বাস্তব। মেট্রোরেল শুধু একটি যানবাহন নয়, এটি বাংলাদেশের নগরজীবনে আধুনিকতার প্রতীক, সময়ের প্রতি শ্রদ্ধা, আর নাগরিক সংস্কৃতির এক নবযাত্রা। ২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর উদ্বোধনের পর থেকে অল্প সময়েই এটি হয়ে উঠেছে ঢাকার মানুষের প্রতিদিনের নির্ভরতার নাম।
মেট্রোরেল শুধু যানবাহন নয়, এটি নগরজীবনের মানসিক পরিবর্তনের প্রতীক; যা মানুষকে, সময়কে মূল্য দেওয়ার শিক্ষা দেয়। ঢাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে যানজটের সঙ্গে বসবাসে অভ্যস্ত ছিল। অফিসে যাওয়ার আগে রাস্তায় আটকে থাকা যেন এক ‘নিত্যকার অনুশোচনা’। কিন্তু মেট্রোরেলের আগমন এই অভ্যাস ভেঙে দিয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ট্রেন আসে, নির্দিষ্ট সময়েই ছাড়ে এক মিনিট দেরি নেই। এই সময়নিষ্ঠ যাত্রা ঢাকাবাসীর মানসিকতায় এক নতুন ভাবনা জাগিয়েছে, তা যেন সময়ই সম্পদ। মেট্রোরেল চালুর আগে উত্তরা থেকে মতিঝিল যেতে যেখানে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগত, এখন সেই পথ মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ মিনিটে অতিক্রম করা সম্ভব। এখন কর্মজীবী মানুষ জানে, সকাল ৮টা ১৫-র ট্রেন ধরলে ৮টা ৩৫-এ অফিসে পৌঁছানো সম্ভব। এ যেন সময় ব্যবস্থাপনার এক নতুন পাঠ। দৈনন্দিন জীবনের এই ছোট পরিবর্তনই মানুষের চিন্তা, কাজ ও জীবনধারায় বড় প্রভাব ফেলছে।
মেট্রোরেল ঢাকাবাসীকে শৃঙ্খলার পথে নতুন নাগরিক অভ্যাস শেখাচ্ছে। মেট্রোরেলে উঠতে হলে লাইনে দাঁড়াতে হয়, টিকিট কিনতে হয় সঠিক নিয়মে, এবং প্রতিটি যাত্রা শুরু হয় পরিচ্ছন্ন স্টেশনের ভিতর দিয়ে। বাংলাদেশের সাধারণ গণপরিবহনে যেখানে ঠেলাঠেলি, চিৎকার, অনিয়ম একসময়ে ‘স্বাভাবিক’ ছিল, সেখানে মেট্রোরেল তৈরি করেছে এক নতুন সংস্কৃতি। এখানে সবাই নিয়ম মেনে চলে, দরজা বন্ধ হলে কেউ আর জোর করে ওঠার চেষ্টা করে না, নামার সময় ‘এক্সিট’ চিহ্ন অনুসরণ করে। এই দৃশ্য একসময় ঢাকার রাস্তায় অকল্পনীয় ছিল। শিক্ষার্থীরা, চাকরিজীবী, এমনকি বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিকরাও এখন ধীরে ধীরে এই শৃঙ্খলার অভ্যস্ত হচ্ছেন। এ যেন এক ‘নাগরিক শৃঙ্খলা আন্দোলন’, যার নেতৃত্ব দিচ্ছে মেট্রোরেল।
মেট্রোরেল ঢাকাবাসীকে পরিচ্ছন্নতা ও সময়নিষ্ঠ জীবনের অনুশীলনে উদ্বুদ্ধ করছে। মেট্রোরেলের প্রতিটি স্টেশন নিখুঁতভাবে পরিচ্ছন্ন রাখা হয়, কোনো আবর্জনা নেই, দেয়ালে পোস্টার নেই, আর ট্রেনের ভেতরে কাগজ বা পানির বোতল ছুড়ে ফেলা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এই পরিবেশে যাত্রীরা নিজেরাও শিখছেন পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার সংস্কৃতি। ঢাকার রাস্তায় ধুলোবালিতে অভ্যস্ত মানুষ যখন প্রথম মেট্রোরেলে ওঠে, তখন সে নীরব, পরিপাটি, শান্ত। এক অন্য পৃথিবী দেখে। এটি শুধু শারীরিক পরিচ্ছন্নতা নয়; এক ধরনের মানসিক শুদ্ধতাও এনে দেয়। মানুষ শিখছে, আধুনিকতার মানে শুধু উন্নত প্রযুক্তি নয়, পরিচ্ছন্ন মন ও আচরণও তার অংশ।
মেট্রোরেল আজ ঢাকাবাসীর মানসিক ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এটি কেবল গতি এনেছে তা নয় পরিবর্তন করছে নাগরিক মানসিকতাও। যে মানুষ আগে নিয়ম ভাঙাকে ‘বুদ্ধি’ মনে করত, সে এখন নিয়ম মানতে গর্ব বোধ করে। যে অফিসে দেরিতে পৌঁছানো একসময়ে স্বাভাবিক ছিল, এখন সেখানে সময়মতো আসা প্রতিযোগিতার বিষয়। এই পরিবর্তনই নগরজীবনের সত্যিকারের নবযুগের সূচনা করেছে। মেট্রোরেল আমাদের শিখিয়েছে, সময়ের প্রতি শ্রদ্ধা, পরিশ্রমের প্রতি সম্মান এবং সহযাত্রীদের প্রতি সহনশীলতাই আধুনিকতার আসল চিহ্ন।
মেট্রোরেল ঢাকাবাসীর ভ্রমণপ্রবণতা ও নাগরিক বিনোদনের নতুন ধারা তৈরি করছে। এটি এখন শুধু যাতায়াত নয়, এক ধরনের ‘নগর অভিজ্ঞতা’। অনেক পরিবার, শিক্ষার্থী ও বিদেশি পর্যটক সপ্তাহান্তে শুধু মেট্রোরেলে চড়তে আসে, এ যেন আধুনিক ঢাকার এক বিনোদনভ্রমণ। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত এই যাত্রায় শহরের এক নতুন দৃশ্য দেখা যায় উচ্চ রেললাইন ধরে দ্রুতগামী ট্রেন, নিচে ছুটে চলা শহরের জীবন। এতে মানুষের মধ্যে ভ্রমণপ্রবণতা বাড়ছে, শহরের প্রতি ভালোবাসা বাড়ছে, আর একটি নতুন ‘নগর-গর্ব’ তৈরি হচ্ছে।
মেট্রোরেল ঢাকার অর্থনীতি ও উৎপাদনশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে। ডি এম টি সি এল (উগঞঈখ)-এর হালনাগাদ তথ্যমতে, বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৩.৫৪.০ লক্ষ মানুষ মেট্রোরেলে যাতায়াত করছেন। বিশেষ দিনে এই সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় ৪.৫ লক্ষেরও বেশি, যেমন ৬ আগস্ট ২০২৫ তারিখে রেকর্ড হয়েছিল ৪৫৬,৭৪৬ জন যাত্রী। এই বিপুল যাত্রীর ধারাবাহিকতা ঢাকার অর্থনীতিতে উৎপাদনশীলতার নতুন দিগন্ত খুলেছে। কর্মজীবীরা সময়মতো অফিসে পৌঁছাতে পারছেন, ফলে কর্মঘণ্টা বাড়ছে, কাজের দক্ষতা বাড়ছে। আয়ের দিক থেকেও এটি একটি বড় সাফল্য। বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের মে মাসে মেট্রোরেলের দৈনিক টিকিট বিক্রির আয় প্রায় ৬.৬৮ মিলিয়ন টাকা (৬৬.৮ লাখ)। এর ভিত্তিতে মার্চ–আগস্ট ২০২৫ পর্যন্ত মাসিক গড় আয় প্রায় ২০২১ কোটি টাকা, আর মোট ছয় মাসে আয় প্রায় ১২৫ কোটি টাকার কাছাকাছি। যদিও বিদ্যুৎ, রক্ষণাবেক্ষণ ও কর্মচারী ব্যয়ের কারণে প্রতিদিন প্রায় ৫৬ লক্ষ টাকা ঘাটতি থাকে, তবে যাত্রীসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই ঘাটতি দ্রুত কমছে। সরকারে সকল প্রকল্প লাভের জন্য নয়; কিছু কিছু প্রকল্প জনসাধারণের এমন উপকারে আসে, যা টাকা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। মেট্রোরেল এমনই একটি প্রকল্প। উগঞঈখ আশা করছে, ২০২৬ সাল নাগাদ প্রকল্পটি আর্থিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারবে।
মেট্রোরেল ঢাকাবাসীর প্রযুক্তি ও ডিজিটাল পেমেন্ট সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিচ্ছে। মেট্রোরেলের টিকিটিং সিস্টেম পুরোপুরি ডিজিটাল। ‘র্যাপিড পাস’ কার্ডের মাধ্যমে যাত্রীরা এখন সহজে ই-লেনদেন করতে পারেন। এই ব্যবস্থা শুধু সময় বাঁচাচ্ছে না, বরং নগদহীন অর্থনীতির পথে বাংলাদেশকে এক ধাপ এগিয়ে নিচ্ছে। অনেক যাত্রী প্রথমবার এই ই-পেমেন্ট ব্যবহার করছেন, এটি তাদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও ডিজিটাল আর্থিক সচেতনতা বাড়াচ্ছে। ভবিষ্যতে মেট্রোরেল কার্ডের মাধ্যমে বাস ও ট্রেন সেবাও একই সঙ্গে ব্যবহার করা যাবে, যা হবে “ঙহব ঈরঃু, ঙহব ঈধৎফ” ধারণার বাস্তবায়ন।
মেট্রোরেল ঢাকার পরিবেশবান্ধব নগর পরিবহনের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে। মেট্রোরেল সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা হওয়ায় এতে কোনো কার্বন নির্গমন হয় না। জ্বালানিচালিত বাস বা ব্যক্তিগত গাড়ির তুলনায় এটি পরিবেশে দূষণ প্রায় ৮০% কমায় (পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমান অনুযায়ী)। ঢাকায় বায়ুদূষণ কমাতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এছাড়া এটি যাত্রীপ্রতি জ্বালানি ব্যয়ও কমায়, ফলে অর্থনৈতিক দিক থেকেও এটি টেকসই। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশকে জলবায়ুবান্ধব উন্নয়নের পথে নিয়ে যাচ্ছে।
মেট্রোরেল ঢাকার নগর অর্থনীতি ও সময়ের রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করছে। চালুর পর শহরের বাণিজ্যিক এলাকাগুলোর গতি বেড়েছে। মতিঝিল, আগারগাঁও, উত্তরা ও বিজয় সরণি এলাকায় জমির মূল্য বেড়েছে ১৫–২০% পর্যন্ত। স্টেশন ঘিরে গড়ে উঠছে ক্ষুদ্র ব্যবসা, কফি শপ, স্টোর যা নগর অর্থনীতিকে চাঙা করছে। একই সঙ্গে সময় বাঁচানোর মাধ্যমে মানুষ জীবনের ভারসাম্য খুঁজে পাচ্ছে; পরিবারে সময় দিতে পারছে, মানসিক চাপ কমছে। এটাই আধুনিক নগরজীবনের লক্ষ্য, গতি ও শান্তির সহাবস্থান। মেট্রোরেল ঢাকার চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার বাস্তব চিত্রও উন্মোচন করছে। অবশ্যই, প্রকল্পটি এখনো উন্নয়নযাত্রায় রয়েছে। লাইন-৬ সম্পূর্ণ চালু হলেও, ভবিষ্যতে লাইন-১, ২ ও ৫ যুক্ত হলে পুরো ঢাকা মহানগরী যুক্ত হবে এক দ্রুতগামী নেটওয়ার্কে। তখন প্রতিদিন প্রায় ১০১২ লক্ষ মানুষ মেট্রোরেল ব্যবহার করবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। তবে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও সংযোগ সড়ক উন্নয়নে আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন। তবুও এটি স্পষ্ট যে, মেট্রোরেল একটি স্থায়ী পরিবর্তনের সূচনা করেছে, যা আগামী এক দশকে ঢাকাকে ভিন্ন রূপে গড়ে তুলবে।
মেট্রোরেল ঢাকার নবযুগের বাস্তব রূপ ফুটিয়ে তুলছে। মেট্রোরেল শুধু স্টিল, কংক্রিট বা ট্র্যাকের সমষ্টি নয় এটি এক মানসিক বিপ্লব। যে মানুষ সময় মানতে শিখেছে, শৃঙ্খলা রক্ষা করছে, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখছে সে আসলে এক নতুন সমাজের নাগরিক। এই নবযুগ শুধু প্রযুক্তির নয়, মানসিকতারও। মেট্রোরেলের প্রতিটি যাত্রা যেন আমাদের শেখায়, “সময় মানা মানেই উন্নয়ন, শৃঙ্খলা মানা মানেই সভ্যতা।” ঢাকার মেট্রোরেল বাংলাদেশের নগর ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়। এটি শুধু যানবাহন নয়, এটি এক সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ। যেখানে সময়ের মূল্য বোঝা, নিয়ম মানা, পরিচ্ছন্নতা ও প্রযুক্তির ব্যবহার মিলেমিশে তৈরি করছে এক আধুনিক নাগরিক সত্তা। মেট্রোরেলের শব্দ যখন শহরের আকাশে প্রতিধ্বনিত হয়, তখন মনে হয়, এটি কেবল একটি ট্রেনের গতি নয়, এটি এক জাতির অগ্রগতির ছন্দ। মেট্রোরেল তাই সত্যিই নগর জীবনের নবযুগের সূচনা।
লেখক: কৃষিবিদ, গবেষক ও কলামিষ্ট।