ইউসুফ আলী বাচ্চু
১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫, 4:26 PM
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ক্ষনে ক্ষনে রাজনীতির রং পরিবর্তন হচ্ছে। এই পরিবর্তনের মধ্যে সরকার নির্বাহী আদেশে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। এর পর আলোচনায় আসতে থাকে আওয়ামী লীগ সরকারে সহযোগী রাজনৈতিক দলগুলোর বিচারের পাশাপশি নিষিদ্ধ চাইছে জামায়াতসহ ইসলামী দলগুলো। এমনকি ১৪ দলীয় জোটের সব দল নিষিদ্ধ চাইছে তারা। মূলত পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠান যদি ইসলামী দলগুলো ব্যর্থ হয় তাহলে যাতে তাদের কোন প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকে এজন্য জাতীয় পার্টিসহ জোটের অন্যান্য দল নিষিদ্ধ চায় বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেকরা। তারা বলছেন, নির্বাচন হলে বিএনপি সরকার গঠন করবে এতে কোন সন্দেহ নেই, কিন্তু বিরোধী দল হবে কারা এটা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিএনপি চাইছে না স্বাধীনতা বিরোধী কোন দল বিরোধী দলে থাকুক। এটা বুজতে পেরে জাতীয় পার্টিসহ কয়েকটি দল নিষদ্ধ চাইছে জামায়াতসহ সম মনারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নির্বাহী আদেশে কোন রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধের বিপক্ষে বিএনপি। তারা বলছে এটা একটি খারাপ নজির স্থাপন করবে। এ বিষয় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমদ বলেছেন, নির্বাহী আদেশে কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা আমরা সমর্থন করি না। বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার বিষয়টি নির্ধারিত হোক। এটা কোর্ট নির্ধারণ করবে। এর জন্য আইন সংশোধন করা হয়েছে। এই আইন আগে ছিল না। এখন গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য যেকোনো দলের বিরুদ্ধে আদালত ব্যবস্থা নিতে পারবেন। আদালত সিদ্ধান্ত নিলে নির্বাচন কমিশন মানতে বাধ্য। এই প্রক্রিয়ার বাইরে কোনো প্রক্রিয়াকে বিএনপি সমর্থন করে না।
কিছু আসন পাওয়ার লোভে জাতীয় স্বার্থের বাইরে গিয়ে কেউ পিআর পদ্ধতি চাইলে তা ভয়ংকর পরিণতি নিয়ে আসবে বলেও মন্তব্য করেন সালাহউদ্দিন আহমদ।
বিএনপি পিআরের পক্ষে নয়, অন্যদিকে কয়েকটি দল পিআরের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সার্বিক বিবেচনায় নির্বাচন পেছানোর আশঙ্কা দেখছে কি না জানতে চাইলে বিএনপির এই নেতা বলেন, নির্বাচনকে বিলম্বিত করার জন্য অথবা বাধাগ্রস্ত করার জন্য যেকোনো রাজনৈতিক কৌশলকে দেশের জনগণ প্রত্যাখ্যান করবে। এটা আমরা আগেও বলেছি। কারণ ভোটাধিকার প্রয়োগের দাবি আদায়ের জন্য, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য, সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, দেশের মানুষ গত ১৬-১৭ বছর অবিরাম সংগ্রাম করেছে, লড়াই করেছে, রক্ত দিয়েছে, শহীদ হয়েছে।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কারের দাবি পরে গণদাবিতে পরিণত হয়েছে। এই অধিকার তখনই প্রতিষ্ঠা হবে যখন আমরা অবাধ-সুষ্ঠু ও গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচনের মাধ্যমে জাতীয় সংসদ পাবো, সরকার পাবো। সুতরাং যারাই এই পথে বাধা সৃষ্টি করতে চাইবে তাদের জনগণ প্রত্যাখ্যান করবে। এসব রাজনৈতিক কর্মসূচির জবাব দেওয়ার জন্য জনগণই বিচারক।
বিএনপি উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতি মেনে নিলে অন্যরা নিম্নকক্ষে প্রচলিত পদ্ধতি মেনে নিতে পারে। এ বিষয়ে বিএনপির অবস্থান জানতে চাইলে সালাহউদ্দিন বলেন, আমরা উচ্চ ও নিম্ন সব জায়গায় পিআরের বিপক্ষে।
সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, দ্রুত গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচন না হলে দেশে একটি সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি হতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট হবে, তখন পতিত ফ্যাসিবাদ সুযোগ নেবে। তাদের হাত ধরে দেশে আঞ্চলিক শক্তি জড়িয়ে যেতে পারে। এটা কেন্দ্র করে বৈশ্বিক শক্তিও সুযোগ নিতে পারে। এতে জাতীয় নিরাপত্তার পাশাপাশি আঞ্চলিক নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
২০২৪ সালের নির্বাচনে ২৮ দল অংশগ্রহণ করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিষিদ্ধ চাইলে এই ২৮টি দলকে দোসর হিসেবে নিষিদ্ধ চাইতে হবে। তাহলে নির্বাচনটা কাদের নিয়ে হবে প্রশ্ন রাখেন সালাহউদ্দিন।
নিজেদের অতিরিক্ত সুবিধার জন্য আরও অনেক দলের নিষিদ্ধ চাইতে পারে। তবে এখানে আওয়ামী লীগের বিষয়টি আলাদা, তারা গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দায়ী, দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংসের জন্য দায়ী। রাজনৈতিক দল হিসেবে আমরাই প্রথম আওয়ামী লীগের বিচারের দাবি করেছিলাম।
এদিকে, জাতীয় নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার পর সংঘাত-সহিংসতা ও নুরুল হক নুরের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বেপরোয়া হামলার ঘটনায় রাজনীতিতে ঘুরপাক খাওয়া প্রশ্নগুলোর অন্যতম হচ্ছে জাতীয় পার্টিকেন্দ্রিক এই অস্থিরতায় কার লাভ, কার ক্ষতি?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউই জাপা নিষিদ্ধের বিষয়টি সাদা চোখে দেখতে বা সাধারণ ঘটনা হিসেবে মানতে রাজি নন। তারা বলছেন, পরিকল্পিতভাবে এসব ঘটনা ঘটানো হচ্ছে, যার লক্ষ্য নির্বাচন বানচাল করা বা নির্বাচন হলেও বিশেষ সুবিধা নেওয়া।
নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সহযোগী হিসেবে জাপা নিষিদ্ধের দাবি যেমন আছে, তেমনি জাপা নিষিদ্ধ হলে জামায়াতে ইসলামি এর সুফল বেশি পেতে পারে বলে রাজনীতিতে আলোচনাও আছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকায় ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা বিএনপির প্রতিপক্ষ এখন জামায়াতে ইসলামি। জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করা গেলে জামায়াত তখন বিএনপির শক্ত বা সবল প্রতিপক্ষ হয়ে উঠতে পারে। এমনকি অন্যান্য ইসলামি দলগুলো সঙ্গে নিয়ে জামায়াত দরকষাকষির সর্বোচ্চ জায়গায় পৌঁছাতে পারে।
পিআর বা সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব না মানলে দলটি নির্বাচন বর্জন বা বয়কটের অবস্থানে গেলে মাঠে আর কোনো বিকল্প শক্তি বা খেলোয়াড় থাকছে না। সে ক্ষেত্রে দেশে বা বিদেশে এই নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা পাবে না, যা প্রকারান্তরে প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের গ্যাঁড়াকলে ফেলবে বিএনপিকে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের পাশাপাশি জাতীয় পার্টিকেও (জাপা) নিষিদ্ধ করার দাবি উঠেছে বারবার। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমে নির্বাহী আদেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তবে জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে এর ছাপ পড়েনি। উলটো দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল সামলাতেই হিমশিম খেতে হয়েছে তাদের।
এমন পরিস্থিতিতে গত শুক্রবার (২৯ আগস্ট) কাকরাইলে জাতীয় পার্টি ও গণঅধিকার পরিষদের মধ্যে সংঘর্ষ এবং তাতে সেনাবাহিনী ও পুলিশের হাতে নুরুল হক নুরের মারধরের শিকার হওয়ার ঘটনায় ফের জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার দাবি উঠেছে। এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।
এক পক্ষের বক্তব্য, টানা তিন মেয়াদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তাদেরই জোটসঙ্গী ছিল জাতীয় পার্টি। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে বিরোধী দল হয়েছে। অথচ ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর আওয়ামী লীগ একপর্যায়ে সাংগঠনিক কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়লেও জাপা বহাল তবিয়তে রয়েছে।
জাতীয় পার্টিকে এখন আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের চেষ্টায় ব্যবহার করার পাশাপাশি আগের মতোই রাষ্ট্রীয় কোনো সংস্থার মধ্যস্থতায় আগামী নির্বাচনে আবারও বিরোধী দল করার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ রয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের।
আওয়ামী লীগকে দেড় দশক ধরে সহযোগিতা করার জন্য জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার দাবি ওঠা স্বাভাবিক বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধ হয়ে ভোট না করতে পারলে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকও গন্তব্য হারাবে। পরোক্ষভাবে সেই সুবিধাও পাবে জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মতো দলগুলো। তুলনামূলকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বিএনপি।
এদিকে অন্য কিছু রাজনৈতিক দলসহ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের কারও কারও আশঙ্কা, কোনো একটি দল কিংবা গোষ্ঠীর চাপে কোনো দলকে নিষিদ্ধ করা হলে পরে তা সরকারের জন্য বুমেরাং হতে পারে। এমনকি জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধের চেষ্টার মাধ্যমে নির্বাচন বানচালের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলার প্রচেষ্টাও দেখছেন অনেকে।
অপরদিকে নুরের আহত হওয়ার ঘটনায় শুক্রবার রাতে ও শনিবার দিনভর একাধিক কর্মসূচি পালন করেছে জামায়াত, এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জুলাইকেন্দ্রিক গড়ে ওঠা একাধিক সংগঠন। তাদের কেউ কেউ প্রকাশ্যে, কেউ কেউ ইঙ্গিতে জাপার কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা দাবি করেছে।
শনিবার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে জামায়াতের ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত গণহত্যাকারী ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের শরিক ১৪ দলকে নিষিদ্ধের দাবি জানান। এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, আওয়ামী লীগের মতো জাতীয় পার্টিও একই দোষে দোষী।
শনিবার ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুস আহমদ এক অনুষ্ঠানে বলেন, ফ্যাসিবাদ উৎখাতে রক্ত ও জীবনের নজরানা দেওয়া হয়েছে। তাই কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদের পুনর্বাসন হতে দেওয়া হবে না।
এ সংঘর্ষ ও ডামাডোলের মধ্যে জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধ করা প্রশ্নে বিএনপি কোনো বক্তব্য দেয়নি। তবে গত বছরের ২ নভেম্বর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, ‘রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার আমরা কারা? জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে।’
জাতীয় পার্টিকে ঘিরে তখনকার পরিস্থিতি সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেছিলেন বিএনপি মহাসচিব। দলটির একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে বলেন, জাপা ইস্যুতে দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে কোনো দিকনির্দেশনা তারা পাননি। তবে দলের মহাসচিবের যে অবস্থান আগে ছিল, সেটিই এখন পর্যন্ত দলীয় অবস্থান।
জাতীয় পার্টির রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সাহাবুল হক বলেন, ১৫ বছর ধরে জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের পুরোপুরি সঙ্গী হিসেবে কাজ করেছে। সরকারি বিরোধী দল, গৃহপালিত বিরোধী দলও ছিল তারা। এখন আওয়ামী লীগকে সরকার যেহেতু নিষিদ্ধ করেছে, তাদের সহযোগী জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোর্শেদ বলেন, অবস্থা এখন এমন হয়েছে, কোনো দলকে নিষিদ্ধ করা না করা এটা মতামত নয়, আপনার সঙ্গে কয়েক শ মানুষ থাকলে আপনি দাবি তুলে ফেলতে পারছেন। দাবি পূরণও হচ্ছে। সরকারের বাহিনী তো স্ট্রং না। যারা এখন মব করছে, জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধ চাচ্ছে, তারাই আবার কিছুদিন পর আরেক দল নিষিদ্ধের দাবি তুলবে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, স্বৈরশাসক এতদিন ক্ষমতায় ছিল। তাকে কিন্তু কোনো নোটিশ দিয়ে সরানো হয়নি। জনগণের চাপে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে। রাজনৈতিক যতই সংকট থাকুক না কেন, কোনো একটি ডিক্রি বা অর্ডার জারি করে কাউকে নিষিদ্ধ করার চেয়ে জাতীয় পার্টির নিষিদ্ধের জন্য জোরালো প্রচারণায় নামা উচিত। জনগণ যদি চায় তাহলে এটা হবে।
জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধের দাবি নিয়ে গত মে মাসে ইসিতে আবেদন জমা হওয়ার পর দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করার দাবি অযৌক্তিক। কারণ নির্বাচন ও গণপ্রতিনিধিত্ব আইনে (আরপিও) জাপা সেই শর্তে পড়ে না।’
সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর বিষয়ে জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘দলীয় কার্যালয়ে হামলা-ভাঙচুরের মধ্য দিয়ে দেশকে বিশৃঙ্খলার দিকে নিয়ে যাওয়ার পাঁয়তারা হচ্ছে। জাতীয় পার্টিকে ভিকটিম করা হচ্ছে। এটা অবশ্যই দুঃখজনক। আশা করি সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথাযথ ভুমিকা রাখবে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য আলমগীর সিকদার লোটন বলেন, আমাদের কাছে মনে হচ্ছে এটি কোনো বড় রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বা পরিকল্পনার অংশ। এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জাপার বহিষ্কৃত কিছু নেতার যোগসূত্র থাকতে পারে, যারা জাতীয় পার্টি পরিচয়ে মাঠে নামার স্বপ্ন দেখছে। যদিও এত বছর তারাই মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য হয়েছেন এবং ফ্যাসিবাদের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী ছিলেন।
এদিকে জাপাকে নিষিদ্ধের বিষয়ে সরাসরি কোনো বক্তব্য আসেনি সরকারের তরফ থেকে। তবে এ বিষয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। এক অনুষ্ঠান শেষে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘বিগত সময়ে আওয়ামী লীগের সব বিতর্কিত নির্বাচন ও জুলাই বিপ্লবে আওয়ামী লীগের দমনপীড়নে সহযোগিতা করেছে জাতীয় পার্টি। এ কারণে জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধের যে দাবি উঠেছে এর আইনি দিক যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে।’
জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধ হলে কার লাভ: আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের শাসনামলে স্পষ্ট সুবিধাভোগী ছিল জাতীয় পার্টি। রাজনৈতিক মহলে দলটির পরিচিতি ছিল ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ হিসেবে।
এদিকে অধিকাংশ মানদণ্ডে ২০০৮ সালের যে জাতীয় নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু বলে বিবেচনা করা হয় সেখানে ভোটের হার ছিল আওয়ামী লীগ ৪৮ শতাংশ, বিএনপি ৩২ দশমিক ৫০ শতাংশ, জাতীয় পার্টি ৭ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ ও জামায়াত ৪ দশমিক ৭০ শতাংশ। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সে নির্বাচনে ২ দশমিক ৯৮ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. জাহেদ উর রহমানের মতে, জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধ হলে জামায়াত-এনসিপির মতো দলগুলো লাভবান হবে। কারণ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম তো নিষিদ্ধ। এখন যদি জাতীয় পার্টিকে সরিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে তাদের সামনে বিএনপি ছাড়া আর কেনো বড় দল থাকবে না। ফলে তারা এখন জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধ করার সর্বাত্মক চেষ্টা করবে।
ইউসুফ আলী বাচ্চু
১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫, 4:26 PM
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ক্ষনে ক্ষনে রাজনীতির রং পরিবর্তন হচ্ছে। এই পরিবর্তনের মধ্যে সরকার নির্বাহী আদেশে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। এর পর আলোচনায় আসতে থাকে আওয়ামী লীগ সরকারে সহযোগী রাজনৈতিক দলগুলোর বিচারের পাশাপশি নিষিদ্ধ চাইছে জামায়াতসহ ইসলামী দলগুলো। এমনকি ১৪ দলীয় জোটের সব দল নিষিদ্ধ চাইছে তারা। মূলত পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠান যদি ইসলামী দলগুলো ব্যর্থ হয় তাহলে যাতে তাদের কোন প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকে এজন্য জাতীয় পার্টিসহ জোটের অন্যান্য দল নিষিদ্ধ চায় বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেকরা। তারা বলছেন, নির্বাচন হলে বিএনপি সরকার গঠন করবে এতে কোন সন্দেহ নেই, কিন্তু বিরোধী দল হবে কারা এটা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিএনপি চাইছে না স্বাধীনতা বিরোধী কোন দল বিরোধী দলে থাকুক। এটা বুজতে পেরে জাতীয় পার্টিসহ কয়েকটি দল নিষদ্ধ চাইছে জামায়াতসহ সম মনারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নির্বাহী আদেশে কোন রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধের বিপক্ষে বিএনপি। তারা বলছে এটা একটি খারাপ নজির স্থাপন করবে। এ বিষয় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমদ বলেছেন, নির্বাহী আদেশে কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা আমরা সমর্থন করি না। বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার বিষয়টি নির্ধারিত হোক। এটা কোর্ট নির্ধারণ করবে। এর জন্য আইন সংশোধন করা হয়েছে। এই আইন আগে ছিল না। এখন গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য যেকোনো দলের বিরুদ্ধে আদালত ব্যবস্থা নিতে পারবেন। আদালত সিদ্ধান্ত নিলে নির্বাচন কমিশন মানতে বাধ্য। এই প্রক্রিয়ার বাইরে কোনো প্রক্রিয়াকে বিএনপি সমর্থন করে না।
কিছু আসন পাওয়ার লোভে জাতীয় স্বার্থের বাইরে গিয়ে কেউ পিআর পদ্ধতি চাইলে তা ভয়ংকর পরিণতি নিয়ে আসবে বলেও মন্তব্য করেন সালাহউদ্দিন আহমদ।
বিএনপি পিআরের পক্ষে নয়, অন্যদিকে কয়েকটি দল পিআরের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সার্বিক বিবেচনায় নির্বাচন পেছানোর আশঙ্কা দেখছে কি না জানতে চাইলে বিএনপির এই নেতা বলেন, নির্বাচনকে বিলম্বিত করার জন্য অথবা বাধাগ্রস্ত করার জন্য যেকোনো রাজনৈতিক কৌশলকে দেশের জনগণ প্রত্যাখ্যান করবে। এটা আমরা আগেও বলেছি। কারণ ভোটাধিকার প্রয়োগের দাবি আদায়ের জন্য, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য, সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, দেশের মানুষ গত ১৬-১৭ বছর অবিরাম সংগ্রাম করেছে, লড়াই করেছে, রক্ত দিয়েছে, শহীদ হয়েছে।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কারের দাবি পরে গণদাবিতে পরিণত হয়েছে। এই অধিকার তখনই প্রতিষ্ঠা হবে যখন আমরা অবাধ-সুষ্ঠু ও গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচনের মাধ্যমে জাতীয় সংসদ পাবো, সরকার পাবো। সুতরাং যারাই এই পথে বাধা সৃষ্টি করতে চাইবে তাদের জনগণ প্রত্যাখ্যান করবে। এসব রাজনৈতিক কর্মসূচির জবাব দেওয়ার জন্য জনগণই বিচারক।
বিএনপি উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতি মেনে নিলে অন্যরা নিম্নকক্ষে প্রচলিত পদ্ধতি মেনে নিতে পারে। এ বিষয়ে বিএনপির অবস্থান জানতে চাইলে সালাহউদ্দিন বলেন, আমরা উচ্চ ও নিম্ন সব জায়গায় পিআরের বিপক্ষে।
সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, দ্রুত গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচন না হলে দেশে একটি সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি হতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট হবে, তখন পতিত ফ্যাসিবাদ সুযোগ নেবে। তাদের হাত ধরে দেশে আঞ্চলিক শক্তি জড়িয়ে যেতে পারে। এটা কেন্দ্র করে বৈশ্বিক শক্তিও সুযোগ নিতে পারে। এতে জাতীয় নিরাপত্তার পাশাপাশি আঞ্চলিক নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
২০২৪ সালের নির্বাচনে ২৮ দল অংশগ্রহণ করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিষিদ্ধ চাইলে এই ২৮টি দলকে দোসর হিসেবে নিষিদ্ধ চাইতে হবে। তাহলে নির্বাচনটা কাদের নিয়ে হবে প্রশ্ন রাখেন সালাহউদ্দিন।
নিজেদের অতিরিক্ত সুবিধার জন্য আরও অনেক দলের নিষিদ্ধ চাইতে পারে। তবে এখানে আওয়ামী লীগের বিষয়টি আলাদা, তারা গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দায়ী, দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংসের জন্য দায়ী। রাজনৈতিক দল হিসেবে আমরাই প্রথম আওয়ামী লীগের বিচারের দাবি করেছিলাম।
এদিকে, জাতীয় নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার পর সংঘাত-সহিংসতা ও নুরুল হক নুরের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বেপরোয়া হামলার ঘটনায় রাজনীতিতে ঘুরপাক খাওয়া প্রশ্নগুলোর অন্যতম হচ্ছে জাতীয় পার্টিকেন্দ্রিক এই অস্থিরতায় কার লাভ, কার ক্ষতি?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউই জাপা নিষিদ্ধের বিষয়টি সাদা চোখে দেখতে বা সাধারণ ঘটনা হিসেবে মানতে রাজি নন। তারা বলছেন, পরিকল্পিতভাবে এসব ঘটনা ঘটানো হচ্ছে, যার লক্ষ্য নির্বাচন বানচাল করা বা নির্বাচন হলেও বিশেষ সুবিধা নেওয়া।
নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সহযোগী হিসেবে জাপা নিষিদ্ধের দাবি যেমন আছে, তেমনি জাপা নিষিদ্ধ হলে জামায়াতে ইসলামি এর সুফল বেশি পেতে পারে বলে রাজনীতিতে আলোচনাও আছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকায় ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা বিএনপির প্রতিপক্ষ এখন জামায়াতে ইসলামি। জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করা গেলে জামায়াত তখন বিএনপির শক্ত বা সবল প্রতিপক্ষ হয়ে উঠতে পারে। এমনকি অন্যান্য ইসলামি দলগুলো সঙ্গে নিয়ে জামায়াত দরকষাকষির সর্বোচ্চ জায়গায় পৌঁছাতে পারে।
পিআর বা সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব না মানলে দলটি নির্বাচন বর্জন বা বয়কটের অবস্থানে গেলে মাঠে আর কোনো বিকল্প শক্তি বা খেলোয়াড় থাকছে না। সে ক্ষেত্রে দেশে বা বিদেশে এই নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা পাবে না, যা প্রকারান্তরে প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের গ্যাঁড়াকলে ফেলবে বিএনপিকে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের পাশাপাশি জাতীয় পার্টিকেও (জাপা) নিষিদ্ধ করার দাবি উঠেছে বারবার। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমে নির্বাহী আদেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তবে জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে এর ছাপ পড়েনি। উলটো দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল সামলাতেই হিমশিম খেতে হয়েছে তাদের।
এমন পরিস্থিতিতে গত শুক্রবার (২৯ আগস্ট) কাকরাইলে জাতীয় পার্টি ও গণঅধিকার পরিষদের মধ্যে সংঘর্ষ এবং তাতে সেনাবাহিনী ও পুলিশের হাতে নুরুল হক নুরের মারধরের শিকার হওয়ার ঘটনায় ফের জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার দাবি উঠেছে। এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।
এক পক্ষের বক্তব্য, টানা তিন মেয়াদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তাদেরই জোটসঙ্গী ছিল জাতীয় পার্টি। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে বিরোধী দল হয়েছে। অথচ ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর আওয়ামী লীগ একপর্যায়ে সাংগঠনিক কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়লেও জাপা বহাল তবিয়তে রয়েছে।
জাতীয় পার্টিকে এখন আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের চেষ্টায় ব্যবহার করার পাশাপাশি আগের মতোই রাষ্ট্রীয় কোনো সংস্থার মধ্যস্থতায় আগামী নির্বাচনে আবারও বিরোধী দল করার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ রয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের।
আওয়ামী লীগকে দেড় দশক ধরে সহযোগিতা করার জন্য জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার দাবি ওঠা স্বাভাবিক বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধ হয়ে ভোট না করতে পারলে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকও গন্তব্য হারাবে। পরোক্ষভাবে সেই সুবিধাও পাবে জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মতো দলগুলো। তুলনামূলকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বিএনপি।
এদিকে অন্য কিছু রাজনৈতিক দলসহ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের কারও কারও আশঙ্কা, কোনো একটি দল কিংবা গোষ্ঠীর চাপে কোনো দলকে নিষিদ্ধ করা হলে পরে তা সরকারের জন্য বুমেরাং হতে পারে। এমনকি জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধের চেষ্টার মাধ্যমে নির্বাচন বানচালের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলার প্রচেষ্টাও দেখছেন অনেকে।
অপরদিকে নুরের আহত হওয়ার ঘটনায় শুক্রবার রাতে ও শনিবার দিনভর একাধিক কর্মসূচি পালন করেছে জামায়াত, এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জুলাইকেন্দ্রিক গড়ে ওঠা একাধিক সংগঠন। তাদের কেউ কেউ প্রকাশ্যে, কেউ কেউ ইঙ্গিতে জাপার কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা দাবি করেছে।
শনিবার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে জামায়াতের ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত গণহত্যাকারী ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের শরিক ১৪ দলকে নিষিদ্ধের দাবি জানান। এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, আওয়ামী লীগের মতো জাতীয় পার্টিও একই দোষে দোষী।
শনিবার ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুস আহমদ এক অনুষ্ঠানে বলেন, ফ্যাসিবাদ উৎখাতে রক্ত ও জীবনের নজরানা দেওয়া হয়েছে। তাই কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদের পুনর্বাসন হতে দেওয়া হবে না।
এ সংঘর্ষ ও ডামাডোলের মধ্যে জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধ করা প্রশ্নে বিএনপি কোনো বক্তব্য দেয়নি। তবে গত বছরের ২ নভেম্বর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, ‘রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার আমরা কারা? জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে।’
জাতীয় পার্টিকে ঘিরে তখনকার পরিস্থিতি সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেছিলেন বিএনপি মহাসচিব। দলটির একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে বলেন, জাপা ইস্যুতে দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে কোনো দিকনির্দেশনা তারা পাননি। তবে দলের মহাসচিবের যে অবস্থান আগে ছিল, সেটিই এখন পর্যন্ত দলীয় অবস্থান।
জাতীয় পার্টির রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সাহাবুল হক বলেন, ১৫ বছর ধরে জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের পুরোপুরি সঙ্গী হিসেবে কাজ করেছে। সরকারি বিরোধী দল, গৃহপালিত বিরোধী দলও ছিল তারা। এখন আওয়ামী লীগকে সরকার যেহেতু নিষিদ্ধ করেছে, তাদের সহযোগী জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোর্শেদ বলেন, অবস্থা এখন এমন হয়েছে, কোনো দলকে নিষিদ্ধ করা না করা এটা মতামত নয়, আপনার সঙ্গে কয়েক শ মানুষ থাকলে আপনি দাবি তুলে ফেলতে পারছেন। দাবি পূরণও হচ্ছে। সরকারের বাহিনী তো স্ট্রং না। যারা এখন মব করছে, জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধ চাচ্ছে, তারাই আবার কিছুদিন পর আরেক দল নিষিদ্ধের দাবি তুলবে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, স্বৈরশাসক এতদিন ক্ষমতায় ছিল। তাকে কিন্তু কোনো নোটিশ দিয়ে সরানো হয়নি। জনগণের চাপে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে। রাজনৈতিক যতই সংকট থাকুক না কেন, কোনো একটি ডিক্রি বা অর্ডার জারি করে কাউকে নিষিদ্ধ করার চেয়ে জাতীয় পার্টির নিষিদ্ধের জন্য জোরালো প্রচারণায় নামা উচিত। জনগণ যদি চায় তাহলে এটা হবে।
জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধের দাবি নিয়ে গত মে মাসে ইসিতে আবেদন জমা হওয়ার পর দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করার দাবি অযৌক্তিক। কারণ নির্বাচন ও গণপ্রতিনিধিত্ব আইনে (আরপিও) জাপা সেই শর্তে পড়ে না।’
সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর বিষয়ে জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘দলীয় কার্যালয়ে হামলা-ভাঙচুরের মধ্য দিয়ে দেশকে বিশৃঙ্খলার দিকে নিয়ে যাওয়ার পাঁয়তারা হচ্ছে। জাতীয় পার্টিকে ভিকটিম করা হচ্ছে। এটা অবশ্যই দুঃখজনক। আশা করি সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথাযথ ভুমিকা রাখবে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য আলমগীর সিকদার লোটন বলেন, আমাদের কাছে মনে হচ্ছে এটি কোনো বড় রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বা পরিকল্পনার অংশ। এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জাপার বহিষ্কৃত কিছু নেতার যোগসূত্র থাকতে পারে, যারা জাতীয় পার্টি পরিচয়ে মাঠে নামার স্বপ্ন দেখছে। যদিও এত বছর তারাই মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য হয়েছেন এবং ফ্যাসিবাদের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী ছিলেন।
এদিকে জাপাকে নিষিদ্ধের বিষয়ে সরাসরি কোনো বক্তব্য আসেনি সরকারের তরফ থেকে। তবে এ বিষয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। এক অনুষ্ঠান শেষে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘বিগত সময়ে আওয়ামী লীগের সব বিতর্কিত নির্বাচন ও জুলাই বিপ্লবে আওয়ামী লীগের দমনপীড়নে সহযোগিতা করেছে জাতীয় পার্টি। এ কারণে জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধের যে দাবি উঠেছে এর আইনি দিক যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে।’
জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধ হলে কার লাভ: আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের শাসনামলে স্পষ্ট সুবিধাভোগী ছিল জাতীয় পার্টি। রাজনৈতিক মহলে দলটির পরিচিতি ছিল ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ হিসেবে।
এদিকে অধিকাংশ মানদণ্ডে ২০০৮ সালের যে জাতীয় নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু বলে বিবেচনা করা হয় সেখানে ভোটের হার ছিল আওয়ামী লীগ ৪৮ শতাংশ, বিএনপি ৩২ দশমিক ৫০ শতাংশ, জাতীয় পার্টি ৭ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ ও জামায়াত ৪ দশমিক ৭০ শতাংশ। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সে নির্বাচনে ২ দশমিক ৯৮ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. জাহেদ উর রহমানের মতে, জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধ হলে জামায়াত-এনসিপির মতো দলগুলো লাভবান হবে। কারণ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম তো নিষিদ্ধ। এখন যদি জাতীয় পার্টিকে সরিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে তাদের সামনে বিএনপি ছাড়া আর কেনো বড় দল থাকবে না। ফলে তারা এখন জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধ করার সর্বাত্মক চেষ্টা করবে।