CKEditor 5 Sample
ঢাকা ২২ জানুয়ারি, ২০২৬

আশুলিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের মাফিয়া সিন্ডিকেট:  মুরাদ জংয়ের বোন পরিচয়ে দলিল দাতা-গ্রহীতাদের জিম্মি করার অভিযোগ

#
news image

আশুলিয়ার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নকল নবীশ দেলোয়ারা আক্তার ওরফে লিপির বিরুদ্ধে রেজিস্টারসহ পুরো অফিস জিম্মি করে হাজিরা ও বালাম না লেখাসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া চাচাত ভাইয়ের পরিচয়ে কামিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। 
জানা গেছে, তিনি সাভারের “গডফাদার” তালুকদার মোহাম্মদ তৌহিদ জং মুরাদ-এর আপন চাচাতো বোন বলে পরিচয় দেন এবং তার প্রভাবেই সাব-রেজিস্ট্রার, নকল নবীশসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জিম্মি করে রেখেছেন বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। তার এসব অনিয়ম-দুর্নীতি এবং নকল নবীশদের হয়রানির অভিযোগের ভিত্তিতে জেলা রেজিস্ট্রার একাধিকবার সাবধান করে দেওয়ার পরও তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে পড়েছেন।
সিন্ডিকেট ও জালিয়াতির অভিযোগ
অভিযোগে জানা গেছে, নকল নবীশ দেলোয়ারা আক্তার ওরফে লিপি আশুলিয়া সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাব-রেজিস্ট্রারদের “বহুল আলোচিত মুরাদ জংয়ের” ভয় দেখিয়ে কতিপয় দলিল লেখক ও ওমেদার মহির হোসেনের নেতৃত্বে এক সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। তার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সাব-রেজিস্ট্রারকে জিম্মি করে জাল দলিল তৈরি ছাড়াও দলিলের পাতা পরিবর্তনসহ সরকারের নিয়ম অমান্য করে সেবা গ্রহীতাদের কাছ থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। তিনি বালাম ও হাজিরায় নাম লেখেন না। আবার নকল লেখার কাজটি ভাগ করে দেওয়ার কথা থাকলেও নকল নবীশ লিপি তা করতে দেন না।

সূত্র জানায়, ঢাকা জেলার অন্যতম রেজিস্ট্রি অফিস হচ্ছে আশুলিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিস। যেখান থেকে সরকারের যে রাজস্ব পাওয়ার কথা, তা সহজে চোখের পলকে এই নকল নবীশ দেলোয়ারা বেগম ওরফে লিপি ও ওমেদার মনি সিন্ডিকেটদের পকেটে চলে যাচ্ছে। পদে নকল নবীশ ও ৬ টাকা মুজরির ওমেদার হলেও, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর ধরে’ এই সাব-রেজিস্ট্রি অফিস জিম্মি করে রাখা হয়েছে।
লিপি আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা তালুকদার মোহাম্মদ তৌহিদ জং মুরাদের ভয় দেখিয়ে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিজস্ব এক সিন্ডিকেটের দল গড়ে তুলেছেন। লিপি সিন্ডিকেটের কথামতো দলিল রেজিস্ট্রি করা, নকল উঠানো, দলিল লেখা, কোনো জমির দলিলে কত দাম বসবে— সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করতে বাধ্য করা হয়। আর এর মাধ্যমে ওমেদার মনির প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা আদায় করছেন। সেই টাকা অফিস শেষে লিপি আক্তার ভাগ করে নেন। এই কাজের মাধ্যমে তারা প্রতিদিন মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে বাসায় ফেরেন।
নকল নবীশদের হয়রানি ও অর্থের লেনদেন
নকল নবীশ অর্থাৎ যে কোনো জমির দলিল সরকারিভাবে রেজিস্ট্রি হওয়ার পর ভবিষ্যতে সেই দলিল ক্রেতার হাতে দেওয়ার জন্য সেই দলিল কপি করে লেখার জন্য সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে নিয়োগ দেওয়া হয়। এসব নকল নবীশদের দৈনিক হাজিরা মাত্র ৪০ টাকা। এই পদে রয়েছেন দেলোয়ারা আক্তার লিপি। তিনি এখন সাভারের আশুলিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের “গডফাদার” নামেই পরিচিতি পেয়েছেন। “গত বছরের ৫ই আগস্ট স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলেও” লিপির কাছে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের অন্যান্য নকল নবীশসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হয়রানি, জুলুম ও দুর্নীতি-ঘুষ বন্ধ হয়নি। তার বিরুদ্ধে যদি কেউ “টু” পর্যন্ত শব্দ করেন, তাহলে তিনি সাভার ও আশুলিয়ার সন্ত্রাসীদের দিয়ে হয়রানি ছাড়াও তাদের অফিস ছাড়া করার ব্যবস্থা করেন। ফলে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ক্রেতা-বিক্রেতা এসে তার সিন্ডিকেটের কাছে হয়রানির শিকার হন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নকল নবীশ জানান, সাভারের আশুলিয়া এলাকায় তাদের বাড়ি। আর আশুলিয়ার সাব-রেজিস্ট্রার অফিস তাদের জায়গায়। তাই তার কথামতো সেখানে দলিল লেখা, দলিলের নকল লেখাসহ যাবতীয় কাজ করতে হবে এবং তার নির্ধারিত অর্থ ঘুষ দিয়েই করতে হবে। ফলে বাধ্য হয়ে আগের সাব-রেজিস্ট্রারগণ সেবা প্রত্যাশীদের কাছ থেকে নির্ধারিত দলিল রেজিস্ট্রির ফিসহ অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেছেন। অতিরিক্ত অর্থগুলো ওমেদার মনির আদায় করতেন। শুধু তাই নয়, সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার আশরাফও “মুরাদ জংয়ের ভয় দেখিয়ে অবৈধ কাজকর্ম” করেছেন। এভাবে লিপি প্রতি মাসে লক্ষাধিক টাকা আয় করেন। সাভার এলাকায় ৩০ হাজার টাকা ফ্ল্যাট ভাড়া থাকেন, অথচ মাত্র ৪০ টাকার মুজরির চাকরি করেন তিনি। এই নকল নবীশ লিপির ভাইও সেখানে দলিল লেখকের কাজ করেন। তিনি সেখানে অন্যান্য নকল নবীশদের কোনো প্রকার কাজ না দেওয়ার হুমকি দেন এবং বলেন যে, কোনো প্রকার প্রতিবাদ করলে তাদের না খেয়ে থাকতে হবে। তাই লিপি যা বলেন, তাই তাদের শুনতে হবে।
ওমেদার মনিরের প্রভাব ও অভিযোগ
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আশুলিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ওমেদার মনির এবং নকল নবীশ দেলোয়ারা আক্তার লিপি আইজিআর অফিসের এক কর্মচারীর ভয় দেখিয়ে পুরো অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জিম্মি করে অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত সাব-রেজিস্ট্রারকে দিয়ে অবৈধ দলিল সৃজনসহ নানা অনিয়ম করানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। তাদের কথামতো সাব-রেজিস্ট্রার দলিল করতে রাজি না হওয়ায় দলিল লেখক কাজলের মাধ্যমে দলিল লেখকদের উসকানি দিয়ে কর্মবিরতির ডাক দেওয়া হয়েছে। লিপি ও ওমেদার মনির দলিল গ্রহীতাসহ সেবা প্রত্যাশীদের কাছ থেকে নানা কৌশলে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া বন্ধ হচ্ছে না।
ওমেদার মনিরের বিরুদ্ধে অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও দুর্নীতির অভিযোগ এবং জনৈক কামরুল ইসলামের দলিল সংক্রান্ত অভিযোগের ভিত্তিতে ঢাকা রেজিস্ট্রারের কার্যালয়, রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের স্মারক নং ১০.০৫.--.০১.২৪.৬২০ এর মাধ্যমে গত বছরের ১১ মার্চ জেলা রেজিস্ট্রার অহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত পত্রের মাধ্যমে ওমেদার মোহাম্মদ মনিরকে জেলা রেজিস্ট্রার ঢাকা কার্যালয়ের সাথে সংযুক্ত করা হয়। কিন্তু ওমেদার মোহাম্মদ মনির আইজিআর অফিসের এক কর্মচারীর প্রভাব এবং “সাবেক আইন-মন্ত্রী আনিসুল হকের এলাকা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হওয়ায় তার ভয় দেখিয়ে” তিনি ঢাকায় সংযুক্ত না হয়ে এখনো বহাল তবিয়তে আশুলিয়া অফিসে প্রকাশ্যে ঘুষ আদায় করছেন। কিন্তু এখনও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি বলে জানা গেছে।
অথচ গত ২০২৪ সালের মার্চ-এপ্রিল মাসের দিকে আশুলিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে এক দুর্র্ধষ চুরির ঘটনা ঘটে। সেই চুরির ঘটনায় ওমেদার মোহাম্মদ মনির হোসেন জড়িত থাকার বিষয়ে অভিযোগ পাওয়া যায়। আবার সেখানে প্রতিদিন প্রায় তিন শতাধিক দলিল রেজিস্ট্রি করা হয়। এসব দলিলের নানা ভুলত্রুটির নাম করে প্রতিটি দলিল হতে ওমেদার মনির হোসেন নিজের জন্য ১ থেকে দেড় হাজার টাকা আদায় করেন। আর সাব-রেজিস্ট্রার ও জেলা রেজিস্ট্রারের নাম করে প্রতিটি দলিল থেকে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত আদায় করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব তথ্যের বিষয়ে আশুলিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সরেজমিনে কয়েকদিন ঘুরে তথ্যের সত্যতা পাওয়া গেছে।
বর্তমান সাব-রেজিস্ট্রারের অবস্থান ও দুদকের অভিযান
একজন ভুক্তভোগী নকল নবীশ জানান, বর্তমানে দায়িত্বপ্রাপ্ত সাব-রেজিস্ট্রার খায়রুল বাশার ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ওমেদার মনির হোসেন ও দেলোয়ারা আক্তার ওরফে লিপির চক্রের সদস্যদের দিয়ে পরিকল্পিতভাবে দলিল লেখকদের ক্ষেপিয়ে তুলেছেন। সেখানে ঘুষ গ্রহণ, স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতি ও অসম্মানজনক আচরণের অভিযোগ তুলে সাব-রেজিস্ট্রারের পদত্যাগের দাবিতে গত ১৭ জুন থেকে কর্মবিরতি পালন করছেন কতিপয় দলিল লেখক। তাদের পরিকল্পিত অভিযোগ হলো সাব-রেজিস্ট্রার ঘুষ ছাড়া দলিল গ্রহণ করেন না। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাব-রেজিস্ট্রার খায়রুল বাশার ভূঁইয়া।
আশুলিয়া সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয় সূত্র জানায়, চলতি বছরের মার্চে খায়রুল বাশার ভূঁইয়া কার্যালয়টিতে সাব-রেজিস্ট্রার পদে যোগদান করেন। তার যোগদানের পর তিনি দলিল নিবন্ধনে জমির শ্রেণি অনুসারে সরকার নির্ধারিত কর আদায় করতে গেলে কতিপয় দলিল লেখকদের সঙ্গে তার মতবিরোধ তৈরি হয়। খাজনা ছাড়া দলিল নিবন্ধন, ভুয়া রশিদ ব্যবহার, উৎস কর ফাঁকি দিয়ে রেজিস্ট্রির মতো অনিয়মের বিরোধিতার কারণেই এই মতবিরোধ হয়।
উল্লেখ্য, নকল নবীশ ও ওমেদারদের উৎকোচ আদায় ও দলিলে তথ্য গোপন করে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়াসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে গত ১৬ এপ্রিল আশুলিয়া সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অভিযান চালিয়েছে। এ সময় সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের বিভিন্ন কক্ষে তল্লাশি এবং রেজিস্ট্রিকৃত দলিল যাচাইয়ে নানা অনিয়মের প্রমাণ পায় দুদক। দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় ঢাকা-২ এর সহকারী পরিচালক ওয়াহিদ মঞ্জুর সোহাগের নেতৃত্বে এই অভিযান চালানো হয়। এ সময় দুদক কর্মকর্তারা আবাসিক স্থাপনাকে বাগান দেখিয়ে দলিলের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার সত্যতা পান। এছাড়াও বিভিন্ন ফি হিসেবে নকল নবীশদের অতিরিক্ত টাকা আদায়সহ নানা অনিয়মের সত্যতা পান। পরে দুদক গুরুত্বপূর্ণ নথি জব্দ করে। অভিযান শেষে দুদকের সহকারী পরিচালক ওয়াহিদ মঞ্জুর সোহাগ বলেন, “দীর্ঘদিন ধরেই আশুলিয়া সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে গোয়েন্দা নজরদারিতে ছিল। পরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়। দুদক সেখানে দালালের দৌরাত্ব ও নকল নবীশদের হয়রানির প্রমাণ পেয়েছেন। এর মধ্যে দলিলে আবাসিক ভবন থাকা সত্ত্বেও তা গোপন করে দলিল করা হয়েছে। ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে।”
আশুলিয়ার সাব-রেজিস্ট্রার খায়রুল বাশার ভূঁইয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে, তিনি দেলোয়ারা আক্তার লিপি সাভারের প্রভাবশালী আওয়ামী লীগের নেতা তালুকদার মোহাম্মদ তৌহিদ মুরাদ জংয়ের প্রভাব খাটিয়ে অন্যান্য নকল নবীশদের হয়রানি ও হুমকির বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৪ জুলাই, ২০২৫,  3:01 PM

news image
লোগো

আশুলিয়ার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নকল নবীশ দেলোয়ারা আক্তার ওরফে লিপির বিরুদ্ধে রেজিস্টারসহ পুরো অফিস জিম্মি করে হাজিরা ও বালাম না লেখাসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া চাচাত ভাইয়ের পরিচয়ে কামিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। 
জানা গেছে, তিনি সাভারের “গডফাদার” তালুকদার মোহাম্মদ তৌহিদ জং মুরাদ-এর আপন চাচাতো বোন বলে পরিচয় দেন এবং তার প্রভাবেই সাব-রেজিস্ট্রার, নকল নবীশসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জিম্মি করে রেখেছেন বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। তার এসব অনিয়ম-দুর্নীতি এবং নকল নবীশদের হয়রানির অভিযোগের ভিত্তিতে জেলা রেজিস্ট্রার একাধিকবার সাবধান করে দেওয়ার পরও তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে পড়েছেন।
সিন্ডিকেট ও জালিয়াতির অভিযোগ
অভিযোগে জানা গেছে, নকল নবীশ দেলোয়ারা আক্তার ওরফে লিপি আশুলিয়া সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাব-রেজিস্ট্রারদের “বহুল আলোচিত মুরাদ জংয়ের” ভয় দেখিয়ে কতিপয় দলিল লেখক ও ওমেদার মহির হোসেনের নেতৃত্বে এক সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। তার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সাব-রেজিস্ট্রারকে জিম্মি করে জাল দলিল তৈরি ছাড়াও দলিলের পাতা পরিবর্তনসহ সরকারের নিয়ম অমান্য করে সেবা গ্রহীতাদের কাছ থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। তিনি বালাম ও হাজিরায় নাম লেখেন না। আবার নকল লেখার কাজটি ভাগ করে দেওয়ার কথা থাকলেও নকল নবীশ লিপি তা করতে দেন না।

সূত্র জানায়, ঢাকা জেলার অন্যতম রেজিস্ট্রি অফিস হচ্ছে আশুলিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিস। যেখান থেকে সরকারের যে রাজস্ব পাওয়ার কথা, তা সহজে চোখের পলকে এই নকল নবীশ দেলোয়ারা বেগম ওরফে লিপি ও ওমেদার মনি সিন্ডিকেটদের পকেটে চলে যাচ্ছে। পদে নকল নবীশ ও ৬ টাকা মুজরির ওমেদার হলেও, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর ধরে’ এই সাব-রেজিস্ট্রি অফিস জিম্মি করে রাখা হয়েছে।
লিপি আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা তালুকদার মোহাম্মদ তৌহিদ জং মুরাদের ভয় দেখিয়ে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিজস্ব এক সিন্ডিকেটের দল গড়ে তুলেছেন। লিপি সিন্ডিকেটের কথামতো দলিল রেজিস্ট্রি করা, নকল উঠানো, দলিল লেখা, কোনো জমির দলিলে কত দাম বসবে— সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করতে বাধ্য করা হয়। আর এর মাধ্যমে ওমেদার মনির প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা আদায় করছেন। সেই টাকা অফিস শেষে লিপি আক্তার ভাগ করে নেন। এই কাজের মাধ্যমে তারা প্রতিদিন মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে বাসায় ফেরেন।
নকল নবীশদের হয়রানি ও অর্থের লেনদেন
নকল নবীশ অর্থাৎ যে কোনো জমির দলিল সরকারিভাবে রেজিস্ট্রি হওয়ার পর ভবিষ্যতে সেই দলিল ক্রেতার হাতে দেওয়ার জন্য সেই দলিল কপি করে লেখার জন্য সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে নিয়োগ দেওয়া হয়। এসব নকল নবীশদের দৈনিক হাজিরা মাত্র ৪০ টাকা। এই পদে রয়েছেন দেলোয়ারা আক্তার লিপি। তিনি এখন সাভারের আশুলিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের “গডফাদার” নামেই পরিচিতি পেয়েছেন। “গত বছরের ৫ই আগস্ট স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলেও” লিপির কাছে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের অন্যান্য নকল নবীশসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হয়রানি, জুলুম ও দুর্নীতি-ঘুষ বন্ধ হয়নি। তার বিরুদ্ধে যদি কেউ “টু” পর্যন্ত শব্দ করেন, তাহলে তিনি সাভার ও আশুলিয়ার সন্ত্রাসীদের দিয়ে হয়রানি ছাড়াও তাদের অফিস ছাড়া করার ব্যবস্থা করেন। ফলে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ক্রেতা-বিক্রেতা এসে তার সিন্ডিকেটের কাছে হয়রানির শিকার হন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নকল নবীশ জানান, সাভারের আশুলিয়া এলাকায় তাদের বাড়ি। আর আশুলিয়ার সাব-রেজিস্ট্রার অফিস তাদের জায়গায়। তাই তার কথামতো সেখানে দলিল লেখা, দলিলের নকল লেখাসহ যাবতীয় কাজ করতে হবে এবং তার নির্ধারিত অর্থ ঘুষ দিয়েই করতে হবে। ফলে বাধ্য হয়ে আগের সাব-রেজিস্ট্রারগণ সেবা প্রত্যাশীদের কাছ থেকে নির্ধারিত দলিল রেজিস্ট্রির ফিসহ অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেছেন। অতিরিক্ত অর্থগুলো ওমেদার মনির আদায় করতেন। শুধু তাই নয়, সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার আশরাফও “মুরাদ জংয়ের ভয় দেখিয়ে অবৈধ কাজকর্ম” করেছেন। এভাবে লিপি প্রতি মাসে লক্ষাধিক টাকা আয় করেন। সাভার এলাকায় ৩০ হাজার টাকা ফ্ল্যাট ভাড়া থাকেন, অথচ মাত্র ৪০ টাকার মুজরির চাকরি করেন তিনি। এই নকল নবীশ লিপির ভাইও সেখানে দলিল লেখকের কাজ করেন। তিনি সেখানে অন্যান্য নকল নবীশদের কোনো প্রকার কাজ না দেওয়ার হুমকি দেন এবং বলেন যে, কোনো প্রকার প্রতিবাদ করলে তাদের না খেয়ে থাকতে হবে। তাই লিপি যা বলেন, তাই তাদের শুনতে হবে।
ওমেদার মনিরের প্রভাব ও অভিযোগ
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আশুলিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ওমেদার মনির এবং নকল নবীশ দেলোয়ারা আক্তার লিপি আইজিআর অফিসের এক কর্মচারীর ভয় দেখিয়ে পুরো অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জিম্মি করে অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত সাব-রেজিস্ট্রারকে দিয়ে অবৈধ দলিল সৃজনসহ নানা অনিয়ম করানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। তাদের কথামতো সাব-রেজিস্ট্রার দলিল করতে রাজি না হওয়ায় দলিল লেখক কাজলের মাধ্যমে দলিল লেখকদের উসকানি দিয়ে কর্মবিরতির ডাক দেওয়া হয়েছে। লিপি ও ওমেদার মনির দলিল গ্রহীতাসহ সেবা প্রত্যাশীদের কাছ থেকে নানা কৌশলে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া বন্ধ হচ্ছে না।
ওমেদার মনিরের বিরুদ্ধে অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও দুর্নীতির অভিযোগ এবং জনৈক কামরুল ইসলামের দলিল সংক্রান্ত অভিযোগের ভিত্তিতে ঢাকা রেজিস্ট্রারের কার্যালয়, রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের স্মারক নং ১০.০৫.--.০১.২৪.৬২০ এর মাধ্যমে গত বছরের ১১ মার্চ জেলা রেজিস্ট্রার অহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত পত্রের মাধ্যমে ওমেদার মোহাম্মদ মনিরকে জেলা রেজিস্ট্রার ঢাকা কার্যালয়ের সাথে সংযুক্ত করা হয়। কিন্তু ওমেদার মোহাম্মদ মনির আইজিআর অফিসের এক কর্মচারীর প্রভাব এবং “সাবেক আইন-মন্ত্রী আনিসুল হকের এলাকা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হওয়ায় তার ভয় দেখিয়ে” তিনি ঢাকায় সংযুক্ত না হয়ে এখনো বহাল তবিয়তে আশুলিয়া অফিসে প্রকাশ্যে ঘুষ আদায় করছেন। কিন্তু এখনও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি বলে জানা গেছে।
অথচ গত ২০২৪ সালের মার্চ-এপ্রিল মাসের দিকে আশুলিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে এক দুর্র্ধষ চুরির ঘটনা ঘটে। সেই চুরির ঘটনায় ওমেদার মোহাম্মদ মনির হোসেন জড়িত থাকার বিষয়ে অভিযোগ পাওয়া যায়। আবার সেখানে প্রতিদিন প্রায় তিন শতাধিক দলিল রেজিস্ট্রি করা হয়। এসব দলিলের নানা ভুলত্রুটির নাম করে প্রতিটি দলিল হতে ওমেদার মনির হোসেন নিজের জন্য ১ থেকে দেড় হাজার টাকা আদায় করেন। আর সাব-রেজিস্ট্রার ও জেলা রেজিস্ট্রারের নাম করে প্রতিটি দলিল থেকে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত আদায় করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব তথ্যের বিষয়ে আশুলিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সরেজমিনে কয়েকদিন ঘুরে তথ্যের সত্যতা পাওয়া গেছে।
বর্তমান সাব-রেজিস্ট্রারের অবস্থান ও দুদকের অভিযান
একজন ভুক্তভোগী নকল নবীশ জানান, বর্তমানে দায়িত্বপ্রাপ্ত সাব-রেজিস্ট্রার খায়রুল বাশার ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ওমেদার মনির হোসেন ও দেলোয়ারা আক্তার ওরফে লিপির চক্রের সদস্যদের দিয়ে পরিকল্পিতভাবে দলিল লেখকদের ক্ষেপিয়ে তুলেছেন। সেখানে ঘুষ গ্রহণ, স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতি ও অসম্মানজনক আচরণের অভিযোগ তুলে সাব-রেজিস্ট্রারের পদত্যাগের দাবিতে গত ১৭ জুন থেকে কর্মবিরতি পালন করছেন কতিপয় দলিল লেখক। তাদের পরিকল্পিত অভিযোগ হলো সাব-রেজিস্ট্রার ঘুষ ছাড়া দলিল গ্রহণ করেন না। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাব-রেজিস্ট্রার খায়রুল বাশার ভূঁইয়া।
আশুলিয়া সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয় সূত্র জানায়, চলতি বছরের মার্চে খায়রুল বাশার ভূঁইয়া কার্যালয়টিতে সাব-রেজিস্ট্রার পদে যোগদান করেন। তার যোগদানের পর তিনি দলিল নিবন্ধনে জমির শ্রেণি অনুসারে সরকার নির্ধারিত কর আদায় করতে গেলে কতিপয় দলিল লেখকদের সঙ্গে তার মতবিরোধ তৈরি হয়। খাজনা ছাড়া দলিল নিবন্ধন, ভুয়া রশিদ ব্যবহার, উৎস কর ফাঁকি দিয়ে রেজিস্ট্রির মতো অনিয়মের বিরোধিতার কারণেই এই মতবিরোধ হয়।
উল্লেখ্য, নকল নবীশ ও ওমেদারদের উৎকোচ আদায় ও দলিলে তথ্য গোপন করে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়াসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে গত ১৬ এপ্রিল আশুলিয়া সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অভিযান চালিয়েছে। এ সময় সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের বিভিন্ন কক্ষে তল্লাশি এবং রেজিস্ট্রিকৃত দলিল যাচাইয়ে নানা অনিয়মের প্রমাণ পায় দুদক। দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় ঢাকা-২ এর সহকারী পরিচালক ওয়াহিদ মঞ্জুর সোহাগের নেতৃত্বে এই অভিযান চালানো হয়। এ সময় দুদক কর্মকর্তারা আবাসিক স্থাপনাকে বাগান দেখিয়ে দলিলের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার সত্যতা পান। এছাড়াও বিভিন্ন ফি হিসেবে নকল নবীশদের অতিরিক্ত টাকা আদায়সহ নানা অনিয়মের সত্যতা পান। পরে দুদক গুরুত্বপূর্ণ নথি জব্দ করে। অভিযান শেষে দুদকের সহকারী পরিচালক ওয়াহিদ মঞ্জুর সোহাগ বলেন, “দীর্ঘদিন ধরেই আশুলিয়া সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে গোয়েন্দা নজরদারিতে ছিল। পরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়। দুদক সেখানে দালালের দৌরাত্ব ও নকল নবীশদের হয়রানির প্রমাণ পেয়েছেন। এর মধ্যে দলিলে আবাসিক ভবন থাকা সত্ত্বেও তা গোপন করে দলিল করা হয়েছে। ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে।”
আশুলিয়ার সাব-রেজিস্ট্রার খায়রুল বাশার ভূঁইয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে, তিনি দেলোয়ারা আক্তার লিপি সাভারের প্রভাবশালী আওয়ামী লীগের নেতা তালুকদার মোহাম্মদ তৌহিদ মুরাদ জংয়ের প্রভাব খাটিয়ে অন্যান্য নকল নবীশদের হয়রানি ও হুমকির বিষয়টি স্বীকার করেছেন।