CKEditor 5 Sample
ঢাকা ২২ জানুয়ারি, ২০২৬

বিআরটিএ এর দুর্নীতির ‘মাস্টারমাইন্ড’ শহীদুল্লাহ এখনো বহাল তবিয়তে

#
news image

সাবেক সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুর কাদেরের প্রেতাত্ত্বা বিআরটিএ এর পরিচালক (ইঞ্জি.) ঢাকা বিভাগের মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারীতার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে অভিযোগ করা হয়েছে। বাংলাদেশ অটোরিকশা, অটোটেম্পু শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আর এ জামান এই অভিযোগ করেছেন।

অভিযোগে জানা গেছে, মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ গত ২০১৯, ২০ ও ২১ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালন করেছেন। চট্টগ্রামে থাকা অবস্থায় সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ক্যাশিয়ার হিসেবে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতিতে লিপ্ত ছিলেন। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, চট্টগ্রামের ১৩ হাজার সিএনজি অটোরিকসার প্রতিস্থাপনে মোটা অংকের টাকার বাণিজ্য। যা বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। আবার তার অন্যতম সহযোগিত চট্ট মেট্রো-১ এর এডি. তৌহিদ হোসেন। বর্তমানে তিনি পদোন্নতি পেয়ে ময়মনসিংহ বিভাগীয় দপ্তরে কর্মরত রয়েছেন। তৌহিদ হোসেন সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব আমানুল্লাহ নুরী ও বিআরটিএ এর সাবেক চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার এর এলাকার লোক হিসেবে ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে চট্টগ্রাম বিআরটিএর কে একটি উৎকোচ বাণিজ্যের স্বর্গরাজ্যে পরিনত করা হয়েছিল। সরকারের পতন হলেও বহাল তবিয়তে চেয়ার ধরে রেখেছেন সেই সব আমলারা। পলাতক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নির্বাচনী ফান্ডে অর্থ যোগানদাতাদের তালিকায় প্রথম দিকেই ছিলেন শহীদুল্লাহর নাম। 

বিআরটিএ সূত্র জানায়, সংস্থাটি থেকে ঘুষ ও চাঁদা তুলে ওবায়দুল কাদেরের ব্যক্তিগত নির্বাচনী তহবিল গঠনে বড় ভূমিকা রাখতেন শহীদুল্লাহ। এই সিন্ডিকেটের অন্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন উপ-পরিচালক ছানাউল হক, মোরছালিন ও রফিকুল ইসলাম। এদের বিরুদ্ধে সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কার্যালয়ে একটি লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে। গত ২০১৯ থেকে ২১ সালের মাঝামাঝি সময় চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনকালে শহীদুল্লাহর বিরুদ্ধে ব্যাপক ঘুষ বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন। চট্টগ্রামে ১৩ হাজার সিএনজি অটোরিকশা প্রতিস্থাপনে প্রতি ইউনিটে ২ লাখ টাকা ও রেজিস্ট্রেশনের জন্য ৫০ হাজার টাকা করে উৎকোচ আদায়ের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। আর তাতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ছিলেন উত্তরা মোটরসের সাতজন ডিলার। এই হিসাবে, শুধু এ প্রকল্প থেকেই ২৮৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা আদায় করা হয়।

এ ছাড়া, ভারতে তৈরি চার আসনের ২ হাজার ম্যাগজিমা অটোরিকশাকে বেআইনিভাবে ৭ আসনের অটো-টেম্পু হিসেবে রেজিস্ট্রেশন দিয়ে গাড়ি প্রতি ২ লাখ টাকা করে মোট ৪০ কোটি টাকা ঘুষ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে চট্টগ্রামের ২০ হাজার ‘গ্রামবাংলা’ সিএনজি অটোরিকশা থেকে গাড়ি প্রতি ৩০ হাজার টাকা করে মোট ৬০ কোটি টাকা গ্রহণের অভিযোগ করা হয়েছে। সবমিলিয়ে চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনকালে শহীদুল্লাহ ও তার সিন্ডিকেট ৩৮৭ কোটি ৫০ লাখ টাকার ঘুষ বাণিজ্যে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

সড়ক পরিবহনের এক সূত্র জানায়, ঢাকা বিভাগীয় বিআরটিএর পরিচালক মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এর মাসিক বেতন ৭১ হাজার টাকা থাকলেও তিনি বসবাস করে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার বাবর রোডস্থ বি-ব্লকের ১৩/এর/১ নম্বর সেলটেক চন্দ্রমিল্লার আলিশান ডুপ্লেক্স এ্যাপার্টমেন্টে। তার শ্যামলী ২ নম্বর সড়কের একটি মার্বেল পাথরে খচিত বিশাল বহুতল বাড়ি রয়েছে। আবার গাজীপুরের জয়দেবপুরে ও চন্দ্রনায় রয়েছে দুইটি নজর কাড়া বাড়ি। গত ২০১৪ সালের ৮ জুলাই তৎকালীণ বিআরটিএর পরিচালক (ইঞ্জি.) রফিকুল হক তালুকদার স্বাক্ষরিত পত্রে বিআরইট এর সকল বিভাগীয় উপ পরিচালক, সহকারি পরিচালকসহ সকল সার্কেলকে রেজিষ্ট্রেশন না করে টু হুইলার, ও থ্রি হুলার ডিলারগণ গাড়ি বিক্রি না করার নির্দেশ দেন। উক্ত নির্দেশনাকে পুঁজি করে শহীদুল্লাহ ডিলারদের সঙ্গে আতাত করে প্রতি গাড়ি হতে ২ লাখ টাকা করে আদায় করেছেন।

জানা গেছে, গত ২০২২ সালে শহীদুল্লাহকে ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক করে তাকে ঢাকায় নিয়ে আসেন ওবায়দুল কাদের, সচিব আমিন উল্লাহ নুরী ও চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার। এখানে এসেও দুর্নীতির ধারা অব্যাহত থাকে। আর ঢাকায় দায়িত্ব পালনের শুরু থেকেই অনিয়ম-দুর্নীতিতে ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে পান পতিত সরকারের সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জি. মোশারফ হোসেনের কথিত ভাতিজা ও ফরিদপুর-৪ এর সাবেক সাংসদ নিক্সন চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামকে। যাকে সম্প্রতি বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ে বদলি করা হয়েছে। বিআরটিএতে দালাল সিন্ডিকেট শক্তিশালী করার মূল কারিগরই ছিলেন এই শহীদুল্লাহ ও রফিকুল। এই দুই কর্মকর্তার কারণে আওয়ামী লীগের আমলে দালাল ছাড়া কোনো কাজই হতো না। কারণ দালাল চক্রের মাধ্যমে কাজ করলেই মিলত মোটা দাগের উৎকোচ।

অভিযোগে আরো জানা গেচে, ঢাকা মেট্রো সার্কেল ১, ২, ৩ ও ৪-এ লাইসেন্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রত্যেক পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে ২ হাজার টাকা করে আদায় করা হয়, যা শহীদুল্লাহ ও তার ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তারা ভাগ করে নিতেন। তাকে মাসে প্রায় ১৮ হাজার পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয় এসব সার্কেলে। ফলে মাসে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং তিন বছরে মোট ১২৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। আর সেই অর্থের একটি অংশ সরাসরি সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নির্বাচনী ফান্ডে জমা করা হতো। শুধু তাই নয়, গত জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলন ঠেকাতে সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের পিএস ও বিআরটিএর সাবেক চেয়ারম্যান গৌতম চন্দ্র পালের সঙ্গে শহীদুল্লাহর ঘনিষ্ঠতারও অভিযোগ উঠেছে। আন্দোলন নস্যাতের ষড়যন্ত্রে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন বলেও দাবি করা হয়েছে।

তাছাড়া, সরকারি কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও শহীদুল্লাহর নামে-বেনামে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে একাধিক বিলাসবহুল বাড়ি। মোহাম্মদপুর বাবর রোডে একটি ডুপ্লেক্স, শ্যামলীতে মার্বেল খচিত বহুতল ভবন এবং গাজীপুরে দুটি বাড়ির কথা অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কোনো কর্মকর্তা এক জায়গায় তিন বছরের বেশি দায়িত্বে থাকতে পারেন না। অথচ শহীদুল্লাহ গত তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে একই পদে বহাল রয়েছে।

বিআরটিএর একজন সাবেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সকালের সময়কে জানান, রাজনৈতিক বা অন্য কারণে যারা এমন দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণ যাদের বিরুদ্ধে আছে তাদেরকে বহাল রাখা অনৈতিক কাজ। কারণ যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের তদন্ত হচ্ছে, সেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেও তাদের কিন্তু সাময়িকভাবে বরখাস্ত করার কথা। অভিযোগ হয়ে থাকলে ও তদন্ত শুরু করলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং তদন্ত সংস্থাগুলোর উচিত সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাদেরকে সাময়িক বহিষ্কার করা।

উক্ত অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, দ্বাদশ জাতীয সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশের সকল বিআরটিএ এর দপ্তরের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুর কাদেরের নির্বাচনী ফান্ড সংগ্রহ করেছেন শহীদুল্লাহ, ছানাউল্লাহ, মোরছালিন ও মো. রফিকুল ইসলাম গং। এছাড়া, সরকারি চাকরীর বিধান মোতাবেক একজন কর্মকর্তা এইক জায়গায় তিন বছরের অধিক সময় না থাকার বিধান থাকলেও মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ তিন বছর ৩ মাস ধরে একই জায়গায় অবস্থান করেছেন। তাদের বদলী করলে কোন সমস্যাই সমাধান হবে না বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। উল্লেখিত ব্যক্তিদের কৃতকর্মের জন্য স্থায়ীভাবে অব্যাহতি প্রদান করলে বিআরটিএর এর কার্যক্রমের গতি ফিরবে বলে অভিযোগকারী মনে করছেন। এর ব্যাপারে বিআরটিএর বর্তমান চেয়ারম্যানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। এ ব্যাপারে শহীদুল্লাহ সঙ্গে যোগাযোগের করা হলে তিনি তার ফোনটি রিসিভ করেন নাই।

 

আব্দুল লতিফ রানা 

৩১ মে, ২০২৫,  7:56 PM

news image

সাবেক সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুর কাদেরের প্রেতাত্ত্বা বিআরটিএ এর পরিচালক (ইঞ্জি.) ঢাকা বিভাগের মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারীতার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে অভিযোগ করা হয়েছে। বাংলাদেশ অটোরিকশা, অটোটেম্পু শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আর এ জামান এই অভিযোগ করেছেন।

অভিযোগে জানা গেছে, মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ গত ২০১৯, ২০ ও ২১ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালন করেছেন। চট্টগ্রামে থাকা অবস্থায় সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ক্যাশিয়ার হিসেবে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতিতে লিপ্ত ছিলেন। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, চট্টগ্রামের ১৩ হাজার সিএনজি অটোরিকসার প্রতিস্থাপনে মোটা অংকের টাকার বাণিজ্য। যা বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। আবার তার অন্যতম সহযোগিত চট্ট মেট্রো-১ এর এডি. তৌহিদ হোসেন। বর্তমানে তিনি পদোন্নতি পেয়ে ময়মনসিংহ বিভাগীয় দপ্তরে কর্মরত রয়েছেন। তৌহিদ হোসেন সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব আমানুল্লাহ নুরী ও বিআরটিএ এর সাবেক চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার এর এলাকার লোক হিসেবে ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে চট্টগ্রাম বিআরটিএর কে একটি উৎকোচ বাণিজ্যের স্বর্গরাজ্যে পরিনত করা হয়েছিল। সরকারের পতন হলেও বহাল তবিয়তে চেয়ার ধরে রেখেছেন সেই সব আমলারা। পলাতক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নির্বাচনী ফান্ডে অর্থ যোগানদাতাদের তালিকায় প্রথম দিকেই ছিলেন শহীদুল্লাহর নাম। 

বিআরটিএ সূত্র জানায়, সংস্থাটি থেকে ঘুষ ও চাঁদা তুলে ওবায়দুল কাদেরের ব্যক্তিগত নির্বাচনী তহবিল গঠনে বড় ভূমিকা রাখতেন শহীদুল্লাহ। এই সিন্ডিকেটের অন্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন উপ-পরিচালক ছানাউল হক, মোরছালিন ও রফিকুল ইসলাম। এদের বিরুদ্ধে সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কার্যালয়ে একটি লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে। গত ২০১৯ থেকে ২১ সালের মাঝামাঝি সময় চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনকালে শহীদুল্লাহর বিরুদ্ধে ব্যাপক ঘুষ বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন। চট্টগ্রামে ১৩ হাজার সিএনজি অটোরিকশা প্রতিস্থাপনে প্রতি ইউনিটে ২ লাখ টাকা ও রেজিস্ট্রেশনের জন্য ৫০ হাজার টাকা করে উৎকোচ আদায়ের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। আর তাতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ছিলেন উত্তরা মোটরসের সাতজন ডিলার। এই হিসাবে, শুধু এ প্রকল্প থেকেই ২৮৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা আদায় করা হয়।

এ ছাড়া, ভারতে তৈরি চার আসনের ২ হাজার ম্যাগজিমা অটোরিকশাকে বেআইনিভাবে ৭ আসনের অটো-টেম্পু হিসেবে রেজিস্ট্রেশন দিয়ে গাড়ি প্রতি ২ লাখ টাকা করে মোট ৪০ কোটি টাকা ঘুষ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে চট্টগ্রামের ২০ হাজার ‘গ্রামবাংলা’ সিএনজি অটোরিকশা থেকে গাড়ি প্রতি ৩০ হাজার টাকা করে মোট ৬০ কোটি টাকা গ্রহণের অভিযোগ করা হয়েছে। সবমিলিয়ে চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনকালে শহীদুল্লাহ ও তার সিন্ডিকেট ৩৮৭ কোটি ৫০ লাখ টাকার ঘুষ বাণিজ্যে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

সড়ক পরিবহনের এক সূত্র জানায়, ঢাকা বিভাগীয় বিআরটিএর পরিচালক মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এর মাসিক বেতন ৭১ হাজার টাকা থাকলেও তিনি বসবাস করে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার বাবর রোডস্থ বি-ব্লকের ১৩/এর/১ নম্বর সেলটেক চন্দ্রমিল্লার আলিশান ডুপ্লেক্স এ্যাপার্টমেন্টে। তার শ্যামলী ২ নম্বর সড়কের একটি মার্বেল পাথরে খচিত বিশাল বহুতল বাড়ি রয়েছে। আবার গাজীপুরের জয়দেবপুরে ও চন্দ্রনায় রয়েছে দুইটি নজর কাড়া বাড়ি। গত ২০১৪ সালের ৮ জুলাই তৎকালীণ বিআরটিএর পরিচালক (ইঞ্জি.) রফিকুল হক তালুকদার স্বাক্ষরিত পত্রে বিআরইট এর সকল বিভাগীয় উপ পরিচালক, সহকারি পরিচালকসহ সকল সার্কেলকে রেজিষ্ট্রেশন না করে টু হুইলার, ও থ্রি হুলার ডিলারগণ গাড়ি বিক্রি না করার নির্দেশ দেন। উক্ত নির্দেশনাকে পুঁজি করে শহীদুল্লাহ ডিলারদের সঙ্গে আতাত করে প্রতি গাড়ি হতে ২ লাখ টাকা করে আদায় করেছেন।

জানা গেছে, গত ২০২২ সালে শহীদুল্লাহকে ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক করে তাকে ঢাকায় নিয়ে আসেন ওবায়দুল কাদের, সচিব আমিন উল্লাহ নুরী ও চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার। এখানে এসেও দুর্নীতির ধারা অব্যাহত থাকে। আর ঢাকায় দায়িত্ব পালনের শুরু থেকেই অনিয়ম-দুর্নীতিতে ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে পান পতিত সরকারের সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জি. মোশারফ হোসেনের কথিত ভাতিজা ও ফরিদপুর-৪ এর সাবেক সাংসদ নিক্সন চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামকে। যাকে সম্প্রতি বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ে বদলি করা হয়েছে। বিআরটিএতে দালাল সিন্ডিকেট শক্তিশালী করার মূল কারিগরই ছিলেন এই শহীদুল্লাহ ও রফিকুল। এই দুই কর্মকর্তার কারণে আওয়ামী লীগের আমলে দালাল ছাড়া কোনো কাজই হতো না। কারণ দালাল চক্রের মাধ্যমে কাজ করলেই মিলত মোটা দাগের উৎকোচ।

অভিযোগে আরো জানা গেচে, ঢাকা মেট্রো সার্কেল ১, ২, ৩ ও ৪-এ লাইসেন্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রত্যেক পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে ২ হাজার টাকা করে আদায় করা হয়, যা শহীদুল্লাহ ও তার ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তারা ভাগ করে নিতেন। তাকে মাসে প্রায় ১৮ হাজার পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয় এসব সার্কেলে। ফলে মাসে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং তিন বছরে মোট ১২৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। আর সেই অর্থের একটি অংশ সরাসরি সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নির্বাচনী ফান্ডে জমা করা হতো। শুধু তাই নয়, গত জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলন ঠেকাতে সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের পিএস ও বিআরটিএর সাবেক চেয়ারম্যান গৌতম চন্দ্র পালের সঙ্গে শহীদুল্লাহর ঘনিষ্ঠতারও অভিযোগ উঠেছে। আন্দোলন নস্যাতের ষড়যন্ত্রে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন বলেও দাবি করা হয়েছে।

তাছাড়া, সরকারি কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও শহীদুল্লাহর নামে-বেনামে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে একাধিক বিলাসবহুল বাড়ি। মোহাম্মদপুর বাবর রোডে একটি ডুপ্লেক্স, শ্যামলীতে মার্বেল খচিত বহুতল ভবন এবং গাজীপুরে দুটি বাড়ির কথা অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কোনো কর্মকর্তা এক জায়গায় তিন বছরের বেশি দায়িত্বে থাকতে পারেন না। অথচ শহীদুল্লাহ গত তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে একই পদে বহাল রয়েছে।

বিআরটিএর একজন সাবেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সকালের সময়কে জানান, রাজনৈতিক বা অন্য কারণে যারা এমন দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণ যাদের বিরুদ্ধে আছে তাদেরকে বহাল রাখা অনৈতিক কাজ। কারণ যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের তদন্ত হচ্ছে, সেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেও তাদের কিন্তু সাময়িকভাবে বরখাস্ত করার কথা। অভিযোগ হয়ে থাকলে ও তদন্ত শুরু করলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং তদন্ত সংস্থাগুলোর উচিত সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাদেরকে সাময়িক বহিষ্কার করা।

উক্ত অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, দ্বাদশ জাতীয সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশের সকল বিআরটিএ এর দপ্তরের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুর কাদেরের নির্বাচনী ফান্ড সংগ্রহ করেছেন শহীদুল্লাহ, ছানাউল্লাহ, মোরছালিন ও মো. রফিকুল ইসলাম গং। এছাড়া, সরকারি চাকরীর বিধান মোতাবেক একজন কর্মকর্তা এইক জায়গায় তিন বছরের অধিক সময় না থাকার বিধান থাকলেও মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ তিন বছর ৩ মাস ধরে একই জায়গায় অবস্থান করেছেন। তাদের বদলী করলে কোন সমস্যাই সমাধান হবে না বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। উল্লেখিত ব্যক্তিদের কৃতকর্মের জন্য স্থায়ীভাবে অব্যাহতি প্রদান করলে বিআরটিএর এর কার্যক্রমের গতি ফিরবে বলে অভিযোগকারী মনে করছেন। এর ব্যাপারে বিআরটিএর বর্তমান চেয়ারম্যানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। এ ব্যাপারে শহীদুল্লাহ সঙ্গে যোগাযোগের করা হলে তিনি তার ফোনটি রিসিভ করেন নাই।