CKEditor 5 Sample
ঢাকা ২২ জানুয়ারি, ২০২৬

যৌনপল্লীর কর্মীরা পেশা পরিবর্তন করতে চায়  

#
news image

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার অদূরে টাঙ্গাইলে প্রায় ২শত বছরের পুরানো যৌনপল্লীর অনেকেই পেশা পরিবর্তন করতে চায়। কয়েক দফায় উচ্ছেদের পর ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে তারা। জেলা শহরের বেবি স্ট্যান্ড  কান্দাপাড়া এলাকায় রয়েছে এই পল্লী। এখানে প্রায় ৫শত ঘরে ৬ শতাধিক কর্মীর বসবাস। ব্রিটিশ আমলে গড়ে ওঠা এ পল্লীতে বর্তমানে বিভিন্ন বয়সী কর্মীরা বসবাস করেন। 
নাম প্রকাশে অনেচ্ছুক একজন কর্মী বলেন, এখানে যারা সুন্দরী ও মাদকের সাথে জড়িত তারাই সুখে শান্তিতে বসবাস করছেন। একমাত্র যারা কৌশলী ও সুন্দরী তাদের কদর রয়েছে, রোজগারও ভালো। এখনও জৈবিক চাহিদা মেটাতে পল্লীতে আসেন কিছু খদ্দের। নেশা গ্রহণে আসেন মাদকসেবীরাও। 
সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জানা যায়, টাঙ্গাইল কান্দাপাড়া এ পল্লীতে প্রায় ৬ শতাধিক কর্মী রয়েছে। তাদের মধ্যে সুশ্রী ও সরাসরি মাদকের সাথে জড়িত কর্মীর সংখ্যা প্রায় এক’শ জনের মতো। বাকি কর্মীদের অনাহারে, অর্ধাহারে দিন কাটছে। প্রতিদিন ঘরভাড়া ও খাবার সংগ্রহ করা তাদের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। পেটের তাগিদে খদ্দেরের খাম খেয়ালীপনায় বেশির ভাগই স্বাভাবিক জৈবিক চাহিদা থেকে অনিরাপদ চাহিদায় রূপ নেয়। অনেকে বাধ্য হয়ে লিপ্ত হন খদ্দেরদের বিকৃত কর্মকাণ্ডে। খদ্দেরের চাহিদা মেটাতে কেউ কেউ হয়ে পরেন গর্ভবতীও। এ বিষয়ে একাধিক কর্মী অভিযোগ করে জানান, এখানে পল্লীর কর্মীরা সারিবদ্ধভাবে বসে থাকে খদ্দেরের জন্য। বেশিরভাগ সময় খদ্দের মেলে না।

কিন্তু যারা মাদকের সাথে জড়িত তাদের কর্মচাঞ্চল্যতা রয়েছে। তাদের কদর বেশি, তারা মাদকসেবিদের আশ্রয় দেয় ও নিজে মাদক গ্রহণ করে। অথচ যারা মাদকের সাথে জড়িত নয় তাদের অনেকেই তিনবেলা ঠিকমত খাবার পায় না। তবে ব্যাতিক্রমও আছে। যারা সুশ্রী তাদের কদর রয়েছে। তাদের রোজগারও ভালো। এই পল্লীর একজন ববি (ছদ্মনাম) বলেন, দালালের খপ্পরে পরে এই পল্লীতে এসেছিলো তার মা। জন্ম এই পল্লীতেই। ছোট বেলায় স্কুলে পড়াশোনা করেছে। যখন বুঝতে শিখলো যে তার মা একজন পতিতা। তার ঘরে নানা বয়সের পুরুষ মানুষ আসে, গল্প করে, হাসাহাসি করে। প্রথম দিকে তা মেনে নিতে কষ্ট হতো। সে সময় অসহায় হয়ে রাস্তায় চলা সমবয়সী মেয়েদের দেখতো। আফসোস করতো তার যদি এমন একটা জীবন থাকতো! যখন বড় হয় মা তখন বৃদ্ধ। দুবেলা খাবার জোটে না তাদের। বাধ্য হয়ে এই পেশায় নিজেকে মানিয়ে নেন। তখন থেকে এখন পর্যন্ত আয় রোজগার ভালই। তারও একটা ৬ মাসের সন্তান আছে। সে চায় তার সন্তান যেন তার মত হীনমন্যতায় না ভোগে। সে যেন কখনও জানতে না পারে তার এই নিষিদ্ধ পল্লীর জীবনের কথা। এ কারনেই আয় রোজগার ভালো থাকা সত্বেও পেশাটা পরিবর্তন করতে চান তিনি।দৌলতদিয়া নিষিদ্ধ পল্লী থেকে আসা কর্মী সুমী (ছদ্মনাম) বলেন, ‘ আদিম এই পেশার কর্মী হিসেবে কাজ করছি ১৪-১৫ বছর। বয়স হওয়ায় এখন আর আয় নেই। তবু এখানেই পরে আছি যাবো কোথায়? নিজ এলাকায় যাওয়ায় কোন সুযোগ নেই। এখানে ছোট্ট একটা দোকান চালাই। চা-কফি সহ ডিম, খিচুড়ি, ভাত বিক্রি করি।  এখানকার কর্মীরাই আমার কাষ্টমার। তারা অনেকেই বাসা ভাড়া দিতে পারে না। বাকি খেতে চায়।

বাকি বিক্রি বন্ধ করে দিছি। তাদের মুখের দিকে চেয়ে খারাপ লাগে কিন্তু কিছু করার নাই। যদি সুযোগ হতো, দুমুঠো ডাল-ভাতের নিশ্চয়তা হতো তাহলে এখান থেকে চলে যেতাম। সব ধর্মের মানুষ এখানে আসে, শুধু যেন আমাদেরই কোন ধর্ম নাই। অপর আর এক কর্মী সোনিয়া (ছদ্মনাম) বলেন, ‘ এই পল্লীতে আগের মতো রোজগার নাই। ঈদ উপলক্ষেও তেমন কোনো রোজগার হয়নি। সরকারি বা বেসরকারি কোনো সাহায্য সহযোগিতা নেই। নিজের খাবার আর বাসা ভাড়া দিতে পারি না। বাসা ভাড়া দিতে না পারায় প্রতিদিনই বাড়ছে দেনা। পেশা বদলের সুযোগ থাকলে অন্য কিছু করতাম। এখন আর ভাল্লাগে না। এখানকার জীবন অনেক কষ্টের। এ বিষয়ে জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘যৌনকর্মীদের প্রতিবন্ধী হিসেবে ট্রিট করি আমরা। সামাজিক প্রতিবন্ধী মেয়েদের জন্য বর্তমানে টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালিত কোনো কার্যক্রম নেই।


এই বিষয় একজন সমাজকর্মী ও গবেষক রোকসনা বন্যা বলেন, অর্থের বিনিময়ে যৌন কাজে লিপ্ত হওয়াকেই পতিতাবৃত্তি বলা হয়ে থাকে। এ পেশাকে বেশ্যাবৃত্তিও বলে অনেকে। অধুনা এদের যৌনকর্মী বলা হয়ে থাকে ।
পতিতাবৃত্তির বিভিন্ন রূপ রয়েছে এবং এর বৈধতাও আছে বিশ্বের প্রায় সবদেশে। সারা বিশ্বে প্রায় ৪২ মিলিয়ন পতিতা রয়েছে। বিশ্বে পতিতাবৃত্তির জন্য অধিকতর সুবিধাজনক অঞ্চল হচ্ছে পর্যটন নগরীগুলো। বিশ্বে এই বৃত্তির বাজার ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
পতিতাবৃত্তি আইনের অবস্থান বিশ্বজুড়ে বিভিন্নভাবে পরিবর্তিত হয়, বিভিন্ন মতামতে প্রতিফলিত হয়। কিছু মতে পতিতাবৃত্তি এক ধরনের শোষণ বা নারীর ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা। যা মানব পাচারের জন্য পরোক্ষভাবে সাহায্য করে। পতিতাবৃত্তির কিছু সমালোচক হলেন ‘নর্ডিক মডেলের’ সমর্থক, যেখানে যৌন বিক্রি আইনত অপরাধ নয়, কিন্তু যৌন ক্রয় অবৈধ।এই পদ্ধতিটি কানাডা, আইসল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, উত্তরআয়ারল্যান্ড, নরওয়ে, ফ্রান্স এবং সুইডেন গ্রহণ করেছে। অন্যরা যৌনকর্মকে বৈধ পেশা হিসেবে দেখেন, যার মাধ্যমে কোনও ব্যক্তি অর্থের বিনিময়ে যৌন ক্রিয়াকলাপ বা বিনিময় করে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল পতিতাবৃত্তি থেকে দণ্ড অপসারণের আহ্বান জানিয়ে আসছে।
জাতিসংঘের একটি সমীক্ষায় বলা হয় সারা বিশ্বে ৪,৫ থেকে ৭,৫ বিলিয়ন ইউরো পতিতাবৃত্তির মাধ্যমে এই ব্যবসায় জড়িত ব্যক্তিরা আয় করে থাকে যা কালোবাজার এবং মাদকদ্রব্য ব্যবসার লভ্যাংশের চেয়ে বেশী। সারাবিশ্বে এক শ্রেণির সংঘবদ্ধ অপরাধীচক্রের মাধ্যমে নারীদের পণ্য বানিয়ে কোটি কোটি টাকা মুনাফা লুটছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বলপূর্বক যৌনদাসী বানিয়ে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা হচ্ছে ।
প্রতি বছর সারাবিশ্বে ৪০ লক্ষ নারী যৌনপণ্য হিসেবে বিক্রি হয়ে পতিতা বৃত্তিতে লিপ্ত হয়। জাতিসংঘ থেকে ১২৭টি দেশে অনুসন্ধান চালিয়ে তথ্যটির সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে।
আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়াকে পতিতা পাচাররের ট্রানজিট দেশ হিসেবে সনাক্ত করা হয়েছে।

আইনি দিক থেকে জবরদস্তিমূলক কাজ বাংলাদেশে নিষিদ্ধ। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৪ অনুচ্ছেদে জবরদস্তিমূলক শ্রম আদায়কে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক প্রকাশিত বাংলা একাডেমির বাংলাপিডিয়ার মধ্যে পরিষ্কার উল্লেখ রয়েছে রাষ্ট্র পতিতাদের কর্ম নিয়ন্ত্রণের জন্য তাদের নাম নিবন্ধন করবে এবং তাদের সুনির্দিষ্ট এলাকায় বসবাসে সীমাবদ্ধ রাখবে।


আমাদের দেশেও অনেকে স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় এই কাজ করে থাকেন। যারা এই পেশায় আসেন তাদের মধ্যে বেশিরভাগ অপারগ হয়ে এই পেশাকে বেছে নিয়েছেন।
বাংলাদেশে টানবাজার নিমতলী যৌনপল্লি উচ্ছেদের প্রতিবাদে হাইকোর্ট বিভাগে একটি রিট পিটিশন দাখিল হয়েছিল। এ পিটিশনের রায়ে বলা হয়, ‘নারী যৌনকর্মী অনূর্ধ্ব ১৮ বছরের হলে এবং যৌন ব্যবসাই তার একমাত্র আয়ের উৎস হিসেবে প্রমাণ করতে পারলে তিনি বৈধভাবে এ ব্যবসায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন।’ কিন্তু আমাদের আইন ও সংবিধান যৌনকর্ম বিষয়ে পরস্পরবিরোধী অবস্থানে। হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী, বাংলাদেশে যৌনকর্ম বৈধ। কিন্তু সংবিধানের ১৮(২) অনুচ্ছেদে বলা হচ্ছে, ‘রাষ্ট্র জুয়া এবং যৌন ব্যবসার বিরুদ্ধে কার্যকরী সুরক্ষা প্রদান করিবে।’

আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এ সুযোগটি ব্যবহার করেই যুগ যুগ ধরে যৌনপল্লি উচ্ছেদ, নানাভাবে যৌনকর্মীদের নির্যাতন ও হয়রানি করে আসছে। অথচ এদের পুনর্বাসন করার কোনো উদ্যোগ নেয়নি রাষ্ট্র। কেউ যদি এই পেশা থেকে স্বেচ্ছায় বের হতে চায় তাহলে রাষ্ট্র তার দায়িত্বে তাদের পুর্নবাস করার কথা। তবে আজ অবদি এমন কোন নজির এই দেশে নেই।

 

ওয়াই এ বাচ্চু

৩০ মে, ২০২৫,  4:34 PM

news image
প্রতিকি ছবি

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার অদূরে টাঙ্গাইলে প্রায় ২শত বছরের পুরানো যৌনপল্লীর অনেকেই পেশা পরিবর্তন করতে চায়। কয়েক দফায় উচ্ছেদের পর ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে তারা। জেলা শহরের বেবি স্ট্যান্ড  কান্দাপাড়া এলাকায় রয়েছে এই পল্লী। এখানে প্রায় ৫শত ঘরে ৬ শতাধিক কর্মীর বসবাস। ব্রিটিশ আমলে গড়ে ওঠা এ পল্লীতে বর্তমানে বিভিন্ন বয়সী কর্মীরা বসবাস করেন। 
নাম প্রকাশে অনেচ্ছুক একজন কর্মী বলেন, এখানে যারা সুন্দরী ও মাদকের সাথে জড়িত তারাই সুখে শান্তিতে বসবাস করছেন। একমাত্র যারা কৌশলী ও সুন্দরী তাদের কদর রয়েছে, রোজগারও ভালো। এখনও জৈবিক চাহিদা মেটাতে পল্লীতে আসেন কিছু খদ্দের। নেশা গ্রহণে আসেন মাদকসেবীরাও। 
সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জানা যায়, টাঙ্গাইল কান্দাপাড়া এ পল্লীতে প্রায় ৬ শতাধিক কর্মী রয়েছে। তাদের মধ্যে সুশ্রী ও সরাসরি মাদকের সাথে জড়িত কর্মীর সংখ্যা প্রায় এক’শ জনের মতো। বাকি কর্মীদের অনাহারে, অর্ধাহারে দিন কাটছে। প্রতিদিন ঘরভাড়া ও খাবার সংগ্রহ করা তাদের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। পেটের তাগিদে খদ্দেরের খাম খেয়ালীপনায় বেশির ভাগই স্বাভাবিক জৈবিক চাহিদা থেকে অনিরাপদ চাহিদায় রূপ নেয়। অনেকে বাধ্য হয়ে লিপ্ত হন খদ্দেরদের বিকৃত কর্মকাণ্ডে। খদ্দেরের চাহিদা মেটাতে কেউ কেউ হয়ে পরেন গর্ভবতীও। এ বিষয়ে একাধিক কর্মী অভিযোগ করে জানান, এখানে পল্লীর কর্মীরা সারিবদ্ধভাবে বসে থাকে খদ্দেরের জন্য। বেশিরভাগ সময় খদ্দের মেলে না।

কিন্তু যারা মাদকের সাথে জড়িত তাদের কর্মচাঞ্চল্যতা রয়েছে। তাদের কদর বেশি, তারা মাদকসেবিদের আশ্রয় দেয় ও নিজে মাদক গ্রহণ করে। অথচ যারা মাদকের সাথে জড়িত নয় তাদের অনেকেই তিনবেলা ঠিকমত খাবার পায় না। তবে ব্যাতিক্রমও আছে। যারা সুশ্রী তাদের কদর রয়েছে। তাদের রোজগারও ভালো। এই পল্লীর একজন ববি (ছদ্মনাম) বলেন, দালালের খপ্পরে পরে এই পল্লীতে এসেছিলো তার মা। জন্ম এই পল্লীতেই। ছোট বেলায় স্কুলে পড়াশোনা করেছে। যখন বুঝতে শিখলো যে তার মা একজন পতিতা। তার ঘরে নানা বয়সের পুরুষ মানুষ আসে, গল্প করে, হাসাহাসি করে। প্রথম দিকে তা মেনে নিতে কষ্ট হতো। সে সময় অসহায় হয়ে রাস্তায় চলা সমবয়সী মেয়েদের দেখতো। আফসোস করতো তার যদি এমন একটা জীবন থাকতো! যখন বড় হয় মা তখন বৃদ্ধ। দুবেলা খাবার জোটে না তাদের। বাধ্য হয়ে এই পেশায় নিজেকে মানিয়ে নেন। তখন থেকে এখন পর্যন্ত আয় রোজগার ভালই। তারও একটা ৬ মাসের সন্তান আছে। সে চায় তার সন্তান যেন তার মত হীনমন্যতায় না ভোগে। সে যেন কখনও জানতে না পারে তার এই নিষিদ্ধ পল্লীর জীবনের কথা। এ কারনেই আয় রোজগার ভালো থাকা সত্বেও পেশাটা পরিবর্তন করতে চান তিনি।দৌলতদিয়া নিষিদ্ধ পল্লী থেকে আসা কর্মী সুমী (ছদ্মনাম) বলেন, ‘ আদিম এই পেশার কর্মী হিসেবে কাজ করছি ১৪-১৫ বছর। বয়স হওয়ায় এখন আর আয় নেই। তবু এখানেই পরে আছি যাবো কোথায়? নিজ এলাকায় যাওয়ায় কোন সুযোগ নেই। এখানে ছোট্ট একটা দোকান চালাই। চা-কফি সহ ডিম, খিচুড়ি, ভাত বিক্রি করি।  এখানকার কর্মীরাই আমার কাষ্টমার। তারা অনেকেই বাসা ভাড়া দিতে পারে না। বাকি খেতে চায়।

বাকি বিক্রি বন্ধ করে দিছি। তাদের মুখের দিকে চেয়ে খারাপ লাগে কিন্তু কিছু করার নাই। যদি সুযোগ হতো, দুমুঠো ডাল-ভাতের নিশ্চয়তা হতো তাহলে এখান থেকে চলে যেতাম। সব ধর্মের মানুষ এখানে আসে, শুধু যেন আমাদেরই কোন ধর্ম নাই। অপর আর এক কর্মী সোনিয়া (ছদ্মনাম) বলেন, ‘ এই পল্লীতে আগের মতো রোজগার নাই। ঈদ উপলক্ষেও তেমন কোনো রোজগার হয়নি। সরকারি বা বেসরকারি কোনো সাহায্য সহযোগিতা নেই। নিজের খাবার আর বাসা ভাড়া দিতে পারি না। বাসা ভাড়া দিতে না পারায় প্রতিদিনই বাড়ছে দেনা। পেশা বদলের সুযোগ থাকলে অন্য কিছু করতাম। এখন আর ভাল্লাগে না। এখানকার জীবন অনেক কষ্টের। এ বিষয়ে জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘যৌনকর্মীদের প্রতিবন্ধী হিসেবে ট্রিট করি আমরা। সামাজিক প্রতিবন্ধী মেয়েদের জন্য বর্তমানে টাঙ্গাইলের সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালিত কোনো কার্যক্রম নেই।


এই বিষয় একজন সমাজকর্মী ও গবেষক রোকসনা বন্যা বলেন, অর্থের বিনিময়ে যৌন কাজে লিপ্ত হওয়াকেই পতিতাবৃত্তি বলা হয়ে থাকে। এ পেশাকে বেশ্যাবৃত্তিও বলে অনেকে। অধুনা এদের যৌনকর্মী বলা হয়ে থাকে ।
পতিতাবৃত্তির বিভিন্ন রূপ রয়েছে এবং এর বৈধতাও আছে বিশ্বের প্রায় সবদেশে। সারা বিশ্বে প্রায় ৪২ মিলিয়ন পতিতা রয়েছে। বিশ্বে পতিতাবৃত্তির জন্য অধিকতর সুবিধাজনক অঞ্চল হচ্ছে পর্যটন নগরীগুলো। বিশ্বে এই বৃত্তির বাজার ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
পতিতাবৃত্তি আইনের অবস্থান বিশ্বজুড়ে বিভিন্নভাবে পরিবর্তিত হয়, বিভিন্ন মতামতে প্রতিফলিত হয়। কিছু মতে পতিতাবৃত্তি এক ধরনের শোষণ বা নারীর ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা। যা মানব পাচারের জন্য পরোক্ষভাবে সাহায্য করে। পতিতাবৃত্তির কিছু সমালোচক হলেন ‘নর্ডিক মডেলের’ সমর্থক, যেখানে যৌন বিক্রি আইনত অপরাধ নয়, কিন্তু যৌন ক্রয় অবৈধ।এই পদ্ধতিটি কানাডা, আইসল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, উত্তরআয়ারল্যান্ড, নরওয়ে, ফ্রান্স এবং সুইডেন গ্রহণ করেছে। অন্যরা যৌনকর্মকে বৈধ পেশা হিসেবে দেখেন, যার মাধ্যমে কোনও ব্যক্তি অর্থের বিনিময়ে যৌন ক্রিয়াকলাপ বা বিনিময় করে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল পতিতাবৃত্তি থেকে দণ্ড অপসারণের আহ্বান জানিয়ে আসছে।
জাতিসংঘের একটি সমীক্ষায় বলা হয় সারা বিশ্বে ৪,৫ থেকে ৭,৫ বিলিয়ন ইউরো পতিতাবৃত্তির মাধ্যমে এই ব্যবসায় জড়িত ব্যক্তিরা আয় করে থাকে যা কালোবাজার এবং মাদকদ্রব্য ব্যবসার লভ্যাংশের চেয়ে বেশী। সারাবিশ্বে এক শ্রেণির সংঘবদ্ধ অপরাধীচক্রের মাধ্যমে নারীদের পণ্য বানিয়ে কোটি কোটি টাকা মুনাফা লুটছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বলপূর্বক যৌনদাসী বানিয়ে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা হচ্ছে ।
প্রতি বছর সারাবিশ্বে ৪০ লক্ষ নারী যৌনপণ্য হিসেবে বিক্রি হয়ে পতিতা বৃত্তিতে লিপ্ত হয়। জাতিসংঘ থেকে ১২৭টি দেশে অনুসন্ধান চালিয়ে তথ্যটির সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে।
আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়াকে পতিতা পাচাররের ট্রানজিট দেশ হিসেবে সনাক্ত করা হয়েছে।

আইনি দিক থেকে জবরদস্তিমূলক কাজ বাংলাদেশে নিষিদ্ধ। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৪ অনুচ্ছেদে জবরদস্তিমূলক শ্রম আদায়কে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক প্রকাশিত বাংলা একাডেমির বাংলাপিডিয়ার মধ্যে পরিষ্কার উল্লেখ রয়েছে রাষ্ট্র পতিতাদের কর্ম নিয়ন্ত্রণের জন্য তাদের নাম নিবন্ধন করবে এবং তাদের সুনির্দিষ্ট এলাকায় বসবাসে সীমাবদ্ধ রাখবে।


আমাদের দেশেও অনেকে স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় এই কাজ করে থাকেন। যারা এই পেশায় আসেন তাদের মধ্যে বেশিরভাগ অপারগ হয়ে এই পেশাকে বেছে নিয়েছেন।
বাংলাদেশে টানবাজার নিমতলী যৌনপল্লি উচ্ছেদের প্রতিবাদে হাইকোর্ট বিভাগে একটি রিট পিটিশন দাখিল হয়েছিল। এ পিটিশনের রায়ে বলা হয়, ‘নারী যৌনকর্মী অনূর্ধ্ব ১৮ বছরের হলে এবং যৌন ব্যবসাই তার একমাত্র আয়ের উৎস হিসেবে প্রমাণ করতে পারলে তিনি বৈধভাবে এ ব্যবসায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন।’ কিন্তু আমাদের আইন ও সংবিধান যৌনকর্ম বিষয়ে পরস্পরবিরোধী অবস্থানে। হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী, বাংলাদেশে যৌনকর্ম বৈধ। কিন্তু সংবিধানের ১৮(২) অনুচ্ছেদে বলা হচ্ছে, ‘রাষ্ট্র জুয়া এবং যৌন ব্যবসার বিরুদ্ধে কার্যকরী সুরক্ষা প্রদান করিবে।’

আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এ সুযোগটি ব্যবহার করেই যুগ যুগ ধরে যৌনপল্লি উচ্ছেদ, নানাভাবে যৌনকর্মীদের নির্যাতন ও হয়রানি করে আসছে। অথচ এদের পুনর্বাসন করার কোনো উদ্যোগ নেয়নি রাষ্ট্র। কেউ যদি এই পেশা থেকে স্বেচ্ছায় বের হতে চায় তাহলে রাষ্ট্র তার দায়িত্বে তাদের পুর্নবাস করার কথা। তবে আজ অবদি এমন কোন নজির এই দেশে নেই।