CKEditor 5 Sample
ঢাকা ২২ জানুয়ারি, ২০২৬

মাছ ধরার শখ অপূর্ণই রইলো রাবি অধ্যাপকের

#
news image

শুক্রবার। মৃদু কুয়াশা। আকাশে ভোরের আলো তখনও দেখা যায়নি। পছন্দের ভেসপায় চড়ে বড়শি হাতে বের হয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন শিক্ষক। উদ্দেশ্য মাছ ধরা। মৃদু শব্দে এগিয়ে চলছে ভেসপা। ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে নওগাঁ-রাজশাহী মহাসড়কের পবা উপজেলার নওহাটা আনসার-ভিডিপি ক্যাম্পের কাছে আসতেই একটি শব্দ । বাসের ধাক্কায় মাটিতে লুটিয়ে পরেন তারা । মাছ ধরার স্বপ্ন অধরাই থেকে যায় অধ্যাপক শিব শংকরের। আহত হন সহকর্মী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান বাদশা। তিনিও এখন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে জীবনের সঙ্গে লড়াই করে চলছেন।

 

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার ভোরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক শিব শংকর রায় (৫৮) ও অধ্যাপক আসাদুজ্জামান বাদশা মোটরসাইকেলে রাজশাহীর মোহনপুরের দিকে মাছ ধরতে যাচ্ছিলেন। অধ্যাপক আসাদুজ্জামানের ভেসপা মোটরসাইকেলের পেছনে বসা ছিলেন অধ্যাপক শিব শংকর। নওহাটা আনসার-ভিডিপি ক্যাম্পের কাছে ভোর সাড়ে পাঁচটার পর একটি বাস তাঁদের মোটরসাইকেলে ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে যায়। দুর্ঘটনায় মাথায় গুরুতর আঘাত পান অধ্যাপক শিব শংকর। স্থানীয়দের ধারণা, ঘটনাস্থলেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা শিব শংকর রায়কে মৃত ঘোষণা করেন। আহত অধ্যাপক আসাদুজ্জামানের হাত ও পায়ে গুরুতর জখম হয়েছে। তাঁর এখনো জ্ঞান ফিরে পাননি। তিনি রামেক হাসপাতালের ৩১ নাম্বার ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

 

অধ্যাপক শিব শংকর রায়ের স্ত্রীর কয়েকমাস আগে ক্যান্সার শনাক্ত হয়। এই নিয়ে তিনি বেশ চিন্তিত ছিলেন। তার ফেসবুক আইডির শেষ পোস্টটিও তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে লিখা। পোস্টে তাঁর এবং তাঁর স্ত্রীর ছবি আছে এবং ক্যাপশনে লিখা আছে, ‘অনেকটা পথ এখনও বাকি...সামনের জানুয়ারিতে ২৯তম বছর হবে।’

 

এই বিষয়ে মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী ইয়াসিন আরাফাত বিজয় বলেন, স্যারের অর্ধাঙ্গিনীর প্রায় দুই মাস আগে ক্যান্সার ধরা পড়েছিলো। স্যার এইটা নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিলেন। প্রায় ক্লাস নিতে নিতে বলতেন তোমাদের ম্যাডামের কিছু হলে আমি বাঁচতে পারবো না। সৃষ্টিকর্তা যেন তোমাদের ম্যাডামের আগে আমাকে এই পৃথিবীতে থেকে নিয়ে যান। আমি বেঁচে থাকা অবস্থায় তার কিছু হয়ে গেলে আমি এই যন্ত্রনা নিতে পারবো না। সৃষ্টিকর্তার হয়তো স্যারের মনের আকুতি শুনেছেন।

 

দুপুর আড়াইটার দিকে অধ্যাপক শিব শংকরের মরদেহ ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের সামনে আনা হয়। উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে সেখানে ভিড় করেন। অনেকের চোখে অশ্রু, কেউ কেউ কান্নায় ভেঙে পড়েন। বিকেল সাড়ে চারটায় রাজশাহীর পঞ্চবটি মহাশ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

 

শিক্ষার্থীরা জানান, তিনি অনেক ভালো মনের মানুষ ছিলেন। তাঁকে সকলে পছন্দ করতেন। তিনি সবার সাথে ভালো আচরণ করতেন। তাঁর শূন্যতা বিভাগে পূরণ হবে না।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দীন খান বলেন, দুই অধ্যাপক আজ ভোরে মাছ শিকারে যাচ্ছিলেন। পথে দুর্ঘটনার শিকার হন। এটা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য খুব বেদনার একটি দিন।

 

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র ও জরুরি বিভাগের ইনচার্জ শংকর কে বিশ্বাস বলেন, অধ্যাপক শিব শংকর রায়কে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছে। অধ্যাপক আসাদুজ্জামান বাদশাকে হাসপাতালের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তিনি পর্যবেক্ষণে আছেন।

 

মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও উপকমিশনার গাজিউর রহমান বলেন, অজ্ঞাত এক বাসের ধাক্কায় এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করছে এবং অজ্ঞাত যানবাহনটি শনাক্তের চেষ্টা চালাচ্ছে বলে জানান তিনি।

 

অধ্যাপক শিব শংকর রায় পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলায় জন্মগ্রহন করেন। তিনি ১৯৯৭ সালে মার্কেটিং বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন এবং ২০১৫ সালে অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। অধ্যাপক শিব শংকর রায় স্ত্রী, এক মেয়ে ও এক ছেলেসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তাঁর মেয়ে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট) থেকে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক সম্পন্ন করে বর্তমানে আমেরিকায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন। তাঁর ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) একই বিষয়ে পড়াশোনা করছেন।

ঐশ্বর্য বিশ্বাস, রাবি

১০ অক্টোবর, ২০২৫,  7:57 PM

news image

শুক্রবার। মৃদু কুয়াশা। আকাশে ভোরের আলো তখনও দেখা যায়নি। পছন্দের ভেসপায় চড়ে বড়শি হাতে বের হয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন শিক্ষক। উদ্দেশ্য মাছ ধরা। মৃদু শব্দে এগিয়ে চলছে ভেসপা। ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে নওগাঁ-রাজশাহী মহাসড়কের পবা উপজেলার নওহাটা আনসার-ভিডিপি ক্যাম্পের কাছে আসতেই একটি শব্দ । বাসের ধাক্কায় মাটিতে লুটিয়ে পরেন তারা । মাছ ধরার স্বপ্ন অধরাই থেকে যায় অধ্যাপক শিব শংকরের। আহত হন সহকর্মী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান বাদশা। তিনিও এখন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে জীবনের সঙ্গে লড়াই করে চলছেন।

 

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার ভোরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক শিব শংকর রায় (৫৮) ও অধ্যাপক আসাদুজ্জামান বাদশা মোটরসাইকেলে রাজশাহীর মোহনপুরের দিকে মাছ ধরতে যাচ্ছিলেন। অধ্যাপক আসাদুজ্জামানের ভেসপা মোটরসাইকেলের পেছনে বসা ছিলেন অধ্যাপক শিব শংকর। নওহাটা আনসার-ভিডিপি ক্যাম্পের কাছে ভোর সাড়ে পাঁচটার পর একটি বাস তাঁদের মোটরসাইকেলে ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে যায়। দুর্ঘটনায় মাথায় গুরুতর আঘাত পান অধ্যাপক শিব শংকর। স্থানীয়দের ধারণা, ঘটনাস্থলেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা শিব শংকর রায়কে মৃত ঘোষণা করেন। আহত অধ্যাপক আসাদুজ্জামানের হাত ও পায়ে গুরুতর জখম হয়েছে। তাঁর এখনো জ্ঞান ফিরে পাননি। তিনি রামেক হাসপাতালের ৩১ নাম্বার ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

 

অধ্যাপক শিব শংকর রায়ের স্ত্রীর কয়েকমাস আগে ক্যান্সার শনাক্ত হয়। এই নিয়ে তিনি বেশ চিন্তিত ছিলেন। তার ফেসবুক আইডির শেষ পোস্টটিও তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে লিখা। পোস্টে তাঁর এবং তাঁর স্ত্রীর ছবি আছে এবং ক্যাপশনে লিখা আছে, ‘অনেকটা পথ এখনও বাকি...সামনের জানুয়ারিতে ২৯তম বছর হবে।’

 

এই বিষয়ে মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী ইয়াসিন আরাফাত বিজয় বলেন, স্যারের অর্ধাঙ্গিনীর প্রায় দুই মাস আগে ক্যান্সার ধরা পড়েছিলো। স্যার এইটা নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিলেন। প্রায় ক্লাস নিতে নিতে বলতেন তোমাদের ম্যাডামের কিছু হলে আমি বাঁচতে পারবো না। সৃষ্টিকর্তা যেন তোমাদের ম্যাডামের আগে আমাকে এই পৃথিবীতে থেকে নিয়ে যান। আমি বেঁচে থাকা অবস্থায় তার কিছু হয়ে গেলে আমি এই যন্ত্রনা নিতে পারবো না। সৃষ্টিকর্তার হয়তো স্যারের মনের আকুতি শুনেছেন।

 

দুপুর আড়াইটার দিকে অধ্যাপক শিব শংকরের মরদেহ ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের সামনে আনা হয়। উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে সেখানে ভিড় করেন। অনেকের চোখে অশ্রু, কেউ কেউ কান্নায় ভেঙে পড়েন। বিকেল সাড়ে চারটায় রাজশাহীর পঞ্চবটি মহাশ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

 

শিক্ষার্থীরা জানান, তিনি অনেক ভালো মনের মানুষ ছিলেন। তাঁকে সকলে পছন্দ করতেন। তিনি সবার সাথে ভালো আচরণ করতেন। তাঁর শূন্যতা বিভাগে পূরণ হবে না।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দীন খান বলেন, দুই অধ্যাপক আজ ভোরে মাছ শিকারে যাচ্ছিলেন। পথে দুর্ঘটনার শিকার হন। এটা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য খুব বেদনার একটি দিন।

 

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র ও জরুরি বিভাগের ইনচার্জ শংকর কে বিশ্বাস বলেন, অধ্যাপক শিব শংকর রায়কে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছে। অধ্যাপক আসাদুজ্জামান বাদশাকে হাসপাতালের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তিনি পর্যবেক্ষণে আছেন।

 

মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও উপকমিশনার গাজিউর রহমান বলেন, অজ্ঞাত এক বাসের ধাক্কায় এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করছে এবং অজ্ঞাত যানবাহনটি শনাক্তের চেষ্টা চালাচ্ছে বলে জানান তিনি।

 

অধ্যাপক শিব শংকর রায় পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলায় জন্মগ্রহন করেন। তিনি ১৯৯৭ সালে মার্কেটিং বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন এবং ২০১৫ সালে অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। অধ্যাপক শিব শংকর রায় স্ত্রী, এক মেয়ে ও এক ছেলেসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তাঁর মেয়ে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট) থেকে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক সম্পন্ন করে বর্তমানে আমেরিকায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন। তাঁর ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) একই বিষয়ে পড়াশোনা করছেন।