CKEditor 5 Sample
ঢাকা ২২ জানুয়ারি, ২০২৬

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির ট্রমা কাটিয়ে উঠবে কীভাবে শিক্ষার্থীরা?

#
news image

গত সোমবার (২১ জুলাই) উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণরত বিমান বিধ্বস্ত হয়। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ২৯ জন নিহত হয়েছেন এবং শতাধিক আহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই শিশু। সহপাঠীদের এমন করুণ পরিণতিতে শিক্ষার্থীরা গভীরভাবে স্তব্ধ। অনেকে নিজ চোখে দেখেছেন শিশুদের পোড়া দেহ, বিচ্ছিন্ন অঙ্গ, এবং রক্তাক্ত এক বিভীষিকাময় পরিবেশ। এই দুঃসহ স্মৃতি কীভাবে কাটিয়ে উঠবে তারা—এই প্রশ্নই এখন সবার মনে।

একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মিরাজ তার অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, "চোখের সামনে অনেক ছোট ভাই-বোনকে পুড়তে দেখেছি। কারও শরীর ছিন্নভিন্ন। বুঝতেই পারছিলাম না—আমি স্বপ্ন দেখছি, নাকি সত্যি!" একই প্রতিষ্ঠানের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী অনিক শেখ বলেন, "জীবনে প্রথম মৃত্যুকে এত কাছ থেকে দেখলাম। আগুন, ধোঁয়া আর ছুটোছুটি—এই শব্দগুলো মাথায় গেঁথে গেল। আমাদের স্কুলটা যেন এক নিমিষেই মৃত্যুপুরী হয়ে উঠল।" নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মিনহাজ জানান, তিনি তখন স্কুল ক্যান্টিনে খাবার খাচ্ছিলেন যখন বিকট শব্দ শুনে দেখেন বিমানটি দোতলা ভবনে পড়ে যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে আগুন ধরে যায়।

মানসিক আঘাত ও এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব: মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় ধরনের দুর্ঘটনা স্বচক্ষে দেখলে সবার মনেই বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে এই ধরনের মানসিক আঘাতের প্রভাব অনেক দীর্ঘস্থায়ী ও ক্ষতিকর হয়। অনাকাঙ্ক্ষিত ট্রমায় শিশুদের মধ্যে দেখা দিতে পারে: তীব্র মানসিক চাপ কনভার্সন ডিজঅর্ডার, সাময়িক উন্মাদনা, প্যানিক অ্যাটাক, দুশ্চিন্তা, অস্বাভাবিক শোকার্ত ভাব

দুই সপ্তাহ পর থেকে কয়েক মাসের মধ্যে আঘাত পরবর্তী মানসিক চাপ, যাকে পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার (পিটিএসডি) বলা হয়, তা দেখা দিতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল চৌধুরী বলেন, "তীব্র শোক বা মানসিক আঘাত পেলে যে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে পিটিএসডি। এই রোগের প্রধান কিছু লক্ষণ হচ্ছে—যে ঘটনা বা অভিজ্ঞতা ব্যক্তির মনে আঘাত সৃষ্টি করেছে, তা বারবার ফিরে আসে। ঘটে যাওয়া ট্রমাটিক ঘটনা কখনও বাস্তব স্মৃতি হয়ে, কখনও কল্পনা বা দুঃস্বপ্নের মধ্যে চলে আসে। ব্যক্তি বারবার সেই স্মৃতিতে আতঙ্কিত বোধ করে, মনে করে তার জীবনে আবারও সেই ভয়াবহ ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। এ ছাড়া আরেকটি লক্ষণ হচ্ছে—ব্যক্তির স্বাভাবিক আবেগের বেশ কিছু পরিবর্তন দেখা যায়, যেমন—অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, ভয়, আতঙ্ক, রাগ বা অস্থিরতা প্রকাশ করা।"

শিশুদের প্রতি দায়িত্বশীল করণীয়

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের শিশু-কিশোর ও পারিবারিক মনোরোগবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, "শিশু-কিশোরদের স্মৃতিতে এই ধরনের ট্রমার অভিজ্ঞতা একটি অস্বাভাবিক গড়ন ও মাত্রা নিয়ে দীর্ঘদিন থেকে যেতে পারে। পরে তাদের মধ্যে দেখা দিতে পারে ব্যক্তিত্বের সমস্যা। যে শিশু বা কিশোর নিজে সরাসরি এ ধরনের দুর্ঘটনা বা ট্রমার মুখোমুখি হয়েছে, কেবল সে নয়, বরং যে শিশু সেটি দেখেছে বা শুনেছে, তারও সমস্যা হতে পারে। মানসিক আঘাত পেতে পারে এমন ঘটনা বা ট্রমার মুখোমুখি হয়েছে এমন শিশুর প্রতি শুরু থেকেই বিশেষ যত্ন নেওয়া উচিত, যাতে এই আঘাত সে কাটিয়ে উঠতে পারে। এ জন্য তার দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।"

বড় ধরনের ট্রমা প্রত্যক্ষ করার পর শিশুদের প্রতি দায়িত্বশীল করণীয় প্রসঙ্গে তিনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন:

ভয়াবহ দৃশ্য থেকে বিরত রাখা: দুর্ঘটনার ভয়াবহ দৃশ্য এবং ঘটনা সরাসরি বা প্রচারমাধ্যমে শিশু-কিশোরদের দেখতে নিরুৎসাহিত করতে হবে। বীভৎস কিছু প্রত্যক্ষ করা থেকে শিশুকে বিরত রাখতে হবে। এক্ষেত্রে প্রচারমাধ্যমগুলোকেও দায়িত্বশীল হতে হবে এবং মৃতদেহের ছবি, আহত মানুষের কাতরানোর দৃশ্য দেখানো থেকে বিরত থাকতে হবে।

পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা: শিশুদের রাতের ঘুম নিশ্চিত করতে হবে। ট্রমার মুখোমুখি হওয়া শিশুর রাতে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে পারে, দুঃস্বপ্ন দেখতে পারে, বিছানায় প্রস্রাব করতে পারে, অস্বাভাবিক আচরণ করতে পারে (যেমন: বিনা কারণে হাসা, কাঁদা, আপনজনকে চিনতে না পারা, কথা বলতে না পারা, খিঁচুনি, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি)। এসব ক্ষেত্রে দ্রুত মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।

আবেগ প্রকাশে সুযোগ দেওয়া: শিশু-কিশোরদের সংবেদনশীল মনকে সুরক্ষা দিতে হবে, তাদের আবেগ ও শোক প্রকাশের সুযোগ দিতে হবে। ট্রমার মুখোমুখি হওয়া শিশুদের কথা মন দিয়ে শুনতে হবে।

জোর না করা: শিশুকে অহেতুক ভয় দেখানো যাবে না। যদি মনে হয় শিশু স্বাভাবিক কাজ করার মতো বা আবার স্কুলে যাওয়ার মতো নিজের মনকে তৈরি করতে পারেনি, শোক কাটিয়ে উঠতে পারেনি, তবে সময় নিতে হবে, জোর করা যাবে না। তাকে স্বাভাবিক আচরণ করতে উৎসাহিত করতে হবে।

এই কঠিন সময়ে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি, যাতে তারা এই ভয়াবহ ট্রমা থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে পারে।

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৪ জুলাই, ২০২৫,  3:53 PM

news image

গত সোমবার (২১ জুলাই) উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণরত বিমান বিধ্বস্ত হয়। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ২৯ জন নিহত হয়েছেন এবং শতাধিক আহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই শিশু। সহপাঠীদের এমন করুণ পরিণতিতে শিক্ষার্থীরা গভীরভাবে স্তব্ধ। অনেকে নিজ চোখে দেখেছেন শিশুদের পোড়া দেহ, বিচ্ছিন্ন অঙ্গ, এবং রক্তাক্ত এক বিভীষিকাময় পরিবেশ। এই দুঃসহ স্মৃতি কীভাবে কাটিয়ে উঠবে তারা—এই প্রশ্নই এখন সবার মনে।

একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মিরাজ তার অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, "চোখের সামনে অনেক ছোট ভাই-বোনকে পুড়তে দেখেছি। কারও শরীর ছিন্নভিন্ন। বুঝতেই পারছিলাম না—আমি স্বপ্ন দেখছি, নাকি সত্যি!" একই প্রতিষ্ঠানের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী অনিক শেখ বলেন, "জীবনে প্রথম মৃত্যুকে এত কাছ থেকে দেখলাম। আগুন, ধোঁয়া আর ছুটোছুটি—এই শব্দগুলো মাথায় গেঁথে গেল। আমাদের স্কুলটা যেন এক নিমিষেই মৃত্যুপুরী হয়ে উঠল।" নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মিনহাজ জানান, তিনি তখন স্কুল ক্যান্টিনে খাবার খাচ্ছিলেন যখন বিকট শব্দ শুনে দেখেন বিমানটি দোতলা ভবনে পড়ে যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে আগুন ধরে যায়।

মানসিক আঘাত ও এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব: মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় ধরনের দুর্ঘটনা স্বচক্ষে দেখলে সবার মনেই বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে এই ধরনের মানসিক আঘাতের প্রভাব অনেক দীর্ঘস্থায়ী ও ক্ষতিকর হয়। অনাকাঙ্ক্ষিত ট্রমায় শিশুদের মধ্যে দেখা দিতে পারে: তীব্র মানসিক চাপ কনভার্সন ডিজঅর্ডার, সাময়িক উন্মাদনা, প্যানিক অ্যাটাক, দুশ্চিন্তা, অস্বাভাবিক শোকার্ত ভাব

দুই সপ্তাহ পর থেকে কয়েক মাসের মধ্যে আঘাত পরবর্তী মানসিক চাপ, যাকে পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার (পিটিএসডি) বলা হয়, তা দেখা দিতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল চৌধুরী বলেন, "তীব্র শোক বা মানসিক আঘাত পেলে যে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে পিটিএসডি। এই রোগের প্রধান কিছু লক্ষণ হচ্ছে—যে ঘটনা বা অভিজ্ঞতা ব্যক্তির মনে আঘাত সৃষ্টি করেছে, তা বারবার ফিরে আসে। ঘটে যাওয়া ট্রমাটিক ঘটনা কখনও বাস্তব স্মৃতি হয়ে, কখনও কল্পনা বা দুঃস্বপ্নের মধ্যে চলে আসে। ব্যক্তি বারবার সেই স্মৃতিতে আতঙ্কিত বোধ করে, মনে করে তার জীবনে আবারও সেই ভয়াবহ ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। এ ছাড়া আরেকটি লক্ষণ হচ্ছে—ব্যক্তির স্বাভাবিক আবেগের বেশ কিছু পরিবর্তন দেখা যায়, যেমন—অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, ভয়, আতঙ্ক, রাগ বা অস্থিরতা প্রকাশ করা।"

শিশুদের প্রতি দায়িত্বশীল করণীয়

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের শিশু-কিশোর ও পারিবারিক মনোরোগবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, "শিশু-কিশোরদের স্মৃতিতে এই ধরনের ট্রমার অভিজ্ঞতা একটি অস্বাভাবিক গড়ন ও মাত্রা নিয়ে দীর্ঘদিন থেকে যেতে পারে। পরে তাদের মধ্যে দেখা দিতে পারে ব্যক্তিত্বের সমস্যা। যে শিশু বা কিশোর নিজে সরাসরি এ ধরনের দুর্ঘটনা বা ট্রমার মুখোমুখি হয়েছে, কেবল সে নয়, বরং যে শিশু সেটি দেখেছে বা শুনেছে, তারও সমস্যা হতে পারে। মানসিক আঘাত পেতে পারে এমন ঘটনা বা ট্রমার মুখোমুখি হয়েছে এমন শিশুর প্রতি শুরু থেকেই বিশেষ যত্ন নেওয়া উচিত, যাতে এই আঘাত সে কাটিয়ে উঠতে পারে। এ জন্য তার দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।"

বড় ধরনের ট্রমা প্রত্যক্ষ করার পর শিশুদের প্রতি দায়িত্বশীল করণীয় প্রসঙ্গে তিনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন:

ভয়াবহ দৃশ্য থেকে বিরত রাখা: দুর্ঘটনার ভয়াবহ দৃশ্য এবং ঘটনা সরাসরি বা প্রচারমাধ্যমে শিশু-কিশোরদের দেখতে নিরুৎসাহিত করতে হবে। বীভৎস কিছু প্রত্যক্ষ করা থেকে শিশুকে বিরত রাখতে হবে। এক্ষেত্রে প্রচারমাধ্যমগুলোকেও দায়িত্বশীল হতে হবে এবং মৃতদেহের ছবি, আহত মানুষের কাতরানোর দৃশ্য দেখানো থেকে বিরত থাকতে হবে।

পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা: শিশুদের রাতের ঘুম নিশ্চিত করতে হবে। ট্রমার মুখোমুখি হওয়া শিশুর রাতে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে পারে, দুঃস্বপ্ন দেখতে পারে, বিছানায় প্রস্রাব করতে পারে, অস্বাভাবিক আচরণ করতে পারে (যেমন: বিনা কারণে হাসা, কাঁদা, আপনজনকে চিনতে না পারা, কথা বলতে না পারা, খিঁচুনি, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি)। এসব ক্ষেত্রে দ্রুত মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।

আবেগ প্রকাশে সুযোগ দেওয়া: শিশু-কিশোরদের সংবেদনশীল মনকে সুরক্ষা দিতে হবে, তাদের আবেগ ও শোক প্রকাশের সুযোগ দিতে হবে। ট্রমার মুখোমুখি হওয়া শিশুদের কথা মন দিয়ে শুনতে হবে।

জোর না করা: শিশুকে অহেতুক ভয় দেখানো যাবে না। যদি মনে হয় শিশু স্বাভাবিক কাজ করার মতো বা আবার স্কুলে যাওয়ার মতো নিজের মনকে তৈরি করতে পারেনি, শোক কাটিয়ে উঠতে পারেনি, তবে সময় নিতে হবে, জোর করা যাবে না। তাকে স্বাভাবিক আচরণ করতে উৎসাহিত করতে হবে।

এই কঠিন সময়ে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি, যাতে তারা এই ভয়াবহ ট্রমা থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে পারে।