নিজস্ব প্রতিবেদক
০৮ জুলাই, ২০২৫, 7:59 PM
ফানি হাসির ভিডিও-ই হচ্ছে টিকটক! ঘরের বউয়ের সাথে রাতে হাসির খুনসুটি ও দারুণ ফানি ভিডিও। শেষ পর্যন্ত আনন্দময় মুহূর্তগুলি স্কুল কলেজের শিক্ষার্থী, তরুণ-তরুণী এমনকি স্বামী স্ত্রীদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষ করে উঠতি বয়সের সুন্দরী তরুনীরাই মৃত্যুর দিকে বেশী ধাবিত হচ্ছে। তারা স্মার্ট মোবাইল সেটে ফানি ভিডিও দেখতে দেখতে কৌতূহল ও আসক্ত হন। পরে নিজেই টিকটক অ্যাকাউন্ট খোলেন। নিজের টুকিটাকি ভিডিও দিতে দিতে টিকটকের কথিত জনপ্রিয় সেলেব্রেটিদের সঙ্গে পরিচিত হন। সম্পর্ক গড়ে ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে তা ভিডিও ধারণ করে মাসের পর মাস অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এমনই এক প্রতারকের নাম মো. শোয়াইব (৪১)। বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রাজধানীতে এক অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করেছে।
জানা গেছে, রাজধানীর শাহজাহানপুর থানার মালিবাগ এলাকায় গোপন সংবাদ ও তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি)। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টিকটকের মাধ্যমে একজন নারীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সেই পরিচয়ের সূত্র ধরে ইমু অ্যাপে তাদের মধ্যে নিয়মিত কথাবার্তা চলতে থাকে। কথোপকথনের একপর্যায়ে শোয়াইব ভিডিও কলের মাধ্যমে ওই নারীর ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত স্ক্রিন রেকর্ড করে সংরক্ষণ করে। এসব ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তার সঙ্গে একাধিকবার শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সূত্রে জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম লাইকি, টিকটক, ইমো, মাইস্পেস, ফেসবুক, ইউটিউব, স্ট্রিমকার, হাইফাইভ, বাদু’সহ বিভিন্ন মাধ্যমে কী ধরনের অপরাধ হচ্ছে, তা নজরদারি করা হচ্ছে। আবার পৃথিবীর কোন কোন দেশে টিকটক-লাইকির মতো অ্যাপ বন্ধ করেছে এবং করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, সেগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। আর টিকটক ভিডিওর মাধ্যমে যে অনৈতিক কার্যক্রম যেমন নারীপাচার, প্রতারণা হচ্ছে, তা বন্ধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছেন।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন (সিসিএ ফাউন্ডেশন) দেশে সুস্থ সাইবার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্ট কাজী মুস্তাফিজ বলেন, ‘ইন্টারনেট ব্যবহারকারী হিসেবে আমরা পৃথিবীর সব মানুষ এক জায়গার বাসিন্দা হয়ে যাই। তাই প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে পৃথিবীর ৭০০ কোটি মানুষের যে কেউ অপরাধী কিংবা ভিকটিম হতে পারি। এজন্য প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার খুব গুরুত্বপূর্ণ। ইন্টারনেটে যেকোনো কাজ আসক্তি কিংবা অনিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে চলে গেলেই বিপদ। যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকুই আমাদের ব্যবহার করা উচিত। টিকটক একটা প্রযুক্তি মাত্র। আর কোনো প্রযুক্তিই সর্বাংশে খারাপ নয়। মূলত সেটি কীভাবে আমরা কাজে লাগাচ্ছি এবং তা ইতিবাচক নাকি। নাকি নীতিবাচক ফল দিচ্ছে, সেটা দেখা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশের উঠতি তরুণ-তরুণীদের একটি অংশ এখন টিকটকসহ বিভিন্ন মিউজিক অ্যাপসমুখী। আর এই অ্যাপসকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে বিভিন্ন গ্রুপ। এসব গ্রুপের নারী সদস্যদের ভারতের বিভিন্ন মার্কেট, সুপার শপ, বিউটি পার্লারে ভালো বেতনে চাকরির অফার দিয়ে প্রলোভনে ফেলে বহুল পরিচিত টিকটকাররা। এরপর নানা কৌশলে ভারতে নিয়ে যান তারা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পৃথক অভিযানে গ্রেফতার টিকটকারদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দেখা গেছে, দেশে টিকটকের আড়ালে মানবপাচার ও অনৈতিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মূলহোতা টিকটক হৃদয়, নদী আক্তার, বস রাফি, ম্যাডাম সাহিদা। এদের মধ্যে কয়েক বছর আগে ভারতে এক তরুনীকে হত্যা ও পাচারের অভিযোগে হৃদয় নামে এক টিকটকারকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর নদী আক্তার, রাফি ও ম্যাডাম সাহিদা গ্রেফতার হন।
উক্ত ঘটনার পর জানা যায়, সারাদেশে টিকটকের আড়ালে চক্রের মাধ্যমে এরই মধ্যে কয়েক হাজার মেয়ে পাচার করা হয়েছে। রাফির মাধ্যমে পাঁচ শতাধিক নারীকে পাচার করা হয়েছে। আর ম্যাডাম সাহিদার দুই মেয়ে সোনিয়া ও তানিয়া পাচার চক্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও সক্রিয়ভাবে জড়িত।
সিআইডির মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্পর্ক গড়ে ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন ও অর্থ আদায়ের অভিযোগে সোমবার শোয়াইব নামে একজন গ্রেফতার করে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি)। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টিকটকের মাধ্যমে নারীর সঙ্গে আসামির পরিচয় হয়। পরিচয়ের সূত্র ধরে ‘ইমু’ অ্যাপে তাদের মধ্যে নিয়মিত কথাবার্তা চলতে থাকে। কথোপকথনের একপর্যায়ে অভিযুক্ত ভিডিও কলের মাধ্যমে নারীর ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত স্ক্রিন রেকর্ড করে সংরক্ষণ করে। পরে এসব ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে নারীর সঙ্গে একাধিকবার শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে। একইসঙ্গে ওই নারীকে ব্ল্যাকমেইল করে ৮ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয়। এরপর আরও অর্থ দাবি করলে ওই নারী তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। পরে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি ইমু অ্যাপে ভিকটিমের ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেয়। ঘটনার পর তিনি রাজধানীর রামপুরা থানা গত ২৩ জুন মামলা করেন। উক্ত পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন এর মামলাটি তদন্ত পূর্বক গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রাজধানীর মালিবাগে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃত শোয়াইব এর বাবার নাম বশির আহামদ। চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী থানার শিলকুপ ইউনিয়নের মনকি চর গ্রামে বলে জানা গেছে।
সিআইডি’র বিশেষ পুলিশ সুপার জসিম উদ্দিন জানান, এর আগে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের পর্নোগ্রাফি ভিডিও প্রস্তুত, সংরক্ষণ ও প্রচারের অভিযোগে এখলাছ আলী (৩০) নামে একজনকে গ্রেফতার করে সিআইডি। গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গী পূর্ব থানাধীন পাগার পাঠানপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি) জানতে পারে যে, বাংলাদেশের একজন নাগরিক অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের পর্নোগ্রাফি ভিডিও বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে তৈরি, সংরক্ষণ ও প্রচার করে আসছিলেন। সাইবার মনিটরিং টিম প্রযুক্তিগত সহায়তায় অভিযুক্তকে সনাক্ত করা হয়। এরপর তাকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি গাজীপুরের হোসেন ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং মিলস লিমিটেডে আইটি বিভাগের সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের পর্নোগ্রাফিক ভিডিও সংগ্রহ করতেন এবং তা মোবাইল ফোনে সংরক্ষণ ও প্রচার করতেন। তার কাছ থেকে একটি স্মার্টফোন জব্দ করা হয়, যার ভেতরে একাধিক শিশু পর্নোগ্রাফির ভিডিও উদ্ধার করা হয়।
মানসিক চিকিৎসকগণ বলছেন, টিকটক ও ফেসবুকে নারীর আসক্তি নানাভাবে ভয়াবহ পরিনতি ডেকে আনছে। যা নারীর মানসিক, শারীরিক, সামাজিক এবং পারিবারিক স্তরে গুরুতর প্রভাব ফেলছে। টিকটক ও ফেসবুকে অন্যের সাজানো গোছানো ও নিখুঁত জীবন দেখে নিজের জীবনের সাথে তুলনা করে নারী হতাশা ও উদ্বেগে ভুগছে। আর পোস্ট করা ছবি বা ভিডিওতে কাঙ্ক্ষিত লাইক-কমেন্ট না পেলে আত্মবিশ্বাস কমে যায় এবং দুশ্চিন্তা বাড়ছে। আবার আত্মবিশ্বাসের অভাব ও হীনম্মন্যতায় পড়ছেন। ফিল্টার ব্যবহার করে নিজেদের ত্রুটি লুকিয়ে সুন্দর ছবি পোস্ট করার প্রবণতা বাস্তবে নিজের চেহারা নিয়ে হীনম্মন্যতা সৃষ্টি করতে পারে। এতে বাস্তব জীবনের প্রতি অনীহা তৈরি হচ্ছে।
এসব নারী বা তরুনীরা অতিরিক্ত টিকটক ও ফেসবুক ব্যবহারের ফলে বাস্তবে মানুষের সাথে যোগাযোগ কমে যায়, যা একাকীত্ব বাড়ায় এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করছে। এদের রাতে অতিরিক্ত সময় ফেসবুকে ব্যয় করার কারণে ঘুমের চক্রে ব্যাঘাত ঘটে, যা দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অন্যদের কার্যকলাপ দেখে কিছু হারানোর ভয় বা “ফোমো” নারীর মধ্যে অস্থিরতা তৈরি করে, যা মানসিক চাপ বাড়ায়।
তাছাড়া শারীরিক সমস্যার মধ্যে স্থূলতা ও শারীরিক নিস্ক্রিয়তায় পড়ছেন। দীর্ঘক্ষণ বসে বা শুয়ে ফেসবুক ব্যবহারের ফলে ওজন বৃদ্ধি পেতে পারে এবং শারীরিক সক্রিয়তা কমে যেতে পারে। অতিরিক্ত সময় বসে থাকার কারণে মেরুদণ্ড ও পিঠে ব্যথা হতে পারে। শুধু তাই নয়, দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে চোখের উপর চাপ পড়ে এবং চোখের বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে।
অপরদিকে সম্পর্কের অবনতি হচ্ছে, অতিরিক্ত ফেসবুক ব্যবহারের কারণে পারিবারিক সদস্যদের সাথে সময় কাটানো কমে যায়। স্বামী-স্ত্রী, সন্তান বা পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে যোগাযোগ কমে আসায় সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। তাদের মধ্যে টিকটক ফেসবুকে নতুন সম্পর্ক তৈরি বা পুরানো সম্পর্কের সাথে মাত্রাতিরিক্ত যোগাযোগ দাম্পত্য জীবনে সন্দেহ ও অবিশ্বাস সৃষ্টি করতে পারে, যা বিবাহ বিচ্ছেদ পর্যন্ত গড়াতে পারে। অনেক জরিপে দেখা গেছে, ডিভোর্সের পেছনে ফেসবুকের ভূমিকা থাকে। এ নিয়ে ভার্চুয়াল জগতের জীবনকে বাস্তব জীবনে মানিয়ে নিতে না পারার কারণে শ্বশুর-শাশুড়ি বা স্বামীর সাথে মতের অমিল দেখা দিতে পারে, যা পারিবারিক কলহের কারণ হতে পারে।
সাইবার বুলিং ও হয়রানি: নারীরা ফেসবুকে প্রায়শই সাইবার বুলিং, আপত্তিকর মন্তব্য, হ্যাকিং, ব্ল্যাকমেইলিং এবং মিথ্যা তথ্যের শিকার হন। অনৈতিক সম্পর্ক ও প্রতারণা বাড়ছে। ফেসবুকের মাধ্যমে অপরিচিতদের সাথে সম্পর্ক গড়ে ওঠার সুযোগ থাকে, যা অনেক সময় অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে যেতে বা প্রতারিত হতে সাহায্য করে। এমনকি প্রেমের ফাঁদে ফেলে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ বা মানবপাচারের ঘটনাও শোনা যাচ্ছে। বিভিন্ন কারণে ফেক আইডি তৈরি করে নারীর সম্মানহানি করা, অশ্লীল ছবি বা ভিডিও ছড়ানো এবং অপপ্রচার চালানোর ঘটনা ঘটে। ফলে কর্মস্থলে বা পড়ালেখায় মনোযোগ কমে যায়। যার ফলে পেশাগত বা শিক্ষাগত জীবনে খারাপ প্রভাব পড়ছে। মূল্যবান সময় অকার্যকর ভিডিও দেখে বা ফেসবুক স্ক্রল করে নষ্ট হয়। যা ব্যক্তিগত ও পেশাগত উন্নয়নে বাধা দেয়। বাস্তবতা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ভার্চুয়াল জগতে অন্যের সাজানো জীবন দেখে বাস্তবতাকে ভুল বোঝা এবং মিথ্যা ও বিভ্রমের জগতে বসবাস করতে হচ্ছে। ফেসবুক ব্যবহারের ইতিবাচক দিক থাকলেও, যখন এটি আসক্তিতে পরিণত হয়। তখন তা নারীর জীবনে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনছে। এর থেকে মুক্তি পেতে সচেতনতা, সময় ব্যবস্থাপনার কৌশল অবলম্বন এবং প্রয়োজনে পেশাদারী সহায়তা গ্রহণ করা জরুরি বলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকগন জানিয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক
০৮ জুলাই, ২০২৫, 7:59 PM
ফানি হাসির ভিডিও-ই হচ্ছে টিকটক! ঘরের বউয়ের সাথে রাতে হাসির খুনসুটি ও দারুণ ফানি ভিডিও। শেষ পর্যন্ত আনন্দময় মুহূর্তগুলি স্কুল কলেজের শিক্ষার্থী, তরুণ-তরুণী এমনকি স্বামী স্ত্রীদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষ করে উঠতি বয়সের সুন্দরী তরুনীরাই মৃত্যুর দিকে বেশী ধাবিত হচ্ছে। তারা স্মার্ট মোবাইল সেটে ফানি ভিডিও দেখতে দেখতে কৌতূহল ও আসক্ত হন। পরে নিজেই টিকটক অ্যাকাউন্ট খোলেন। নিজের টুকিটাকি ভিডিও দিতে দিতে টিকটকের কথিত জনপ্রিয় সেলেব্রেটিদের সঙ্গে পরিচিত হন। সম্পর্ক গড়ে ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে তা ভিডিও ধারণ করে মাসের পর মাস অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এমনই এক প্রতারকের নাম মো. শোয়াইব (৪১)। বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রাজধানীতে এক অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করেছে।
জানা গেছে, রাজধানীর শাহজাহানপুর থানার মালিবাগ এলাকায় গোপন সংবাদ ও তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি)। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টিকটকের মাধ্যমে একজন নারীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সেই পরিচয়ের সূত্র ধরে ইমু অ্যাপে তাদের মধ্যে নিয়মিত কথাবার্তা চলতে থাকে। কথোপকথনের একপর্যায়ে শোয়াইব ভিডিও কলের মাধ্যমে ওই নারীর ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত স্ক্রিন রেকর্ড করে সংরক্ষণ করে। এসব ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তার সঙ্গে একাধিকবার শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সূত্রে জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম লাইকি, টিকটক, ইমো, মাইস্পেস, ফেসবুক, ইউটিউব, স্ট্রিমকার, হাইফাইভ, বাদু’সহ বিভিন্ন মাধ্যমে কী ধরনের অপরাধ হচ্ছে, তা নজরদারি করা হচ্ছে। আবার পৃথিবীর কোন কোন দেশে টিকটক-লাইকির মতো অ্যাপ বন্ধ করেছে এবং করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, সেগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। আর টিকটক ভিডিওর মাধ্যমে যে অনৈতিক কার্যক্রম যেমন নারীপাচার, প্রতারণা হচ্ছে, তা বন্ধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছেন।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন (সিসিএ ফাউন্ডেশন) দেশে সুস্থ সাইবার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্ট কাজী মুস্তাফিজ বলেন, ‘ইন্টারনেট ব্যবহারকারী হিসেবে আমরা পৃথিবীর সব মানুষ এক জায়গার বাসিন্দা হয়ে যাই। তাই প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে পৃথিবীর ৭০০ কোটি মানুষের যে কেউ অপরাধী কিংবা ভিকটিম হতে পারি। এজন্য প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার খুব গুরুত্বপূর্ণ। ইন্টারনেটে যেকোনো কাজ আসক্তি কিংবা অনিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে চলে গেলেই বিপদ। যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকুই আমাদের ব্যবহার করা উচিত। টিকটক একটা প্রযুক্তি মাত্র। আর কোনো প্রযুক্তিই সর্বাংশে খারাপ নয়। মূলত সেটি কীভাবে আমরা কাজে লাগাচ্ছি এবং তা ইতিবাচক নাকি। নাকি নীতিবাচক ফল দিচ্ছে, সেটা দেখা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশের উঠতি তরুণ-তরুণীদের একটি অংশ এখন টিকটকসহ বিভিন্ন মিউজিক অ্যাপসমুখী। আর এই অ্যাপসকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে বিভিন্ন গ্রুপ। এসব গ্রুপের নারী সদস্যদের ভারতের বিভিন্ন মার্কেট, সুপার শপ, বিউটি পার্লারে ভালো বেতনে চাকরির অফার দিয়ে প্রলোভনে ফেলে বহুল পরিচিত টিকটকাররা। এরপর নানা কৌশলে ভারতে নিয়ে যান তারা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পৃথক অভিযানে গ্রেফতার টিকটকারদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দেখা গেছে, দেশে টিকটকের আড়ালে মানবপাচার ও অনৈতিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মূলহোতা টিকটক হৃদয়, নদী আক্তার, বস রাফি, ম্যাডাম সাহিদা। এদের মধ্যে কয়েক বছর আগে ভারতে এক তরুনীকে হত্যা ও পাচারের অভিযোগে হৃদয় নামে এক টিকটকারকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর নদী আক্তার, রাফি ও ম্যাডাম সাহিদা গ্রেফতার হন।
উক্ত ঘটনার পর জানা যায়, সারাদেশে টিকটকের আড়ালে চক্রের মাধ্যমে এরই মধ্যে কয়েক হাজার মেয়ে পাচার করা হয়েছে। রাফির মাধ্যমে পাঁচ শতাধিক নারীকে পাচার করা হয়েছে। আর ম্যাডাম সাহিদার দুই মেয়ে সোনিয়া ও তানিয়া পাচার চক্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও সক্রিয়ভাবে জড়িত।
সিআইডির মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্পর্ক গড়ে ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন ও অর্থ আদায়ের অভিযোগে সোমবার শোয়াইব নামে একজন গ্রেফতার করে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি)। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টিকটকের মাধ্যমে নারীর সঙ্গে আসামির পরিচয় হয়। পরিচয়ের সূত্র ধরে ‘ইমু’ অ্যাপে তাদের মধ্যে নিয়মিত কথাবার্তা চলতে থাকে। কথোপকথনের একপর্যায়ে অভিযুক্ত ভিডিও কলের মাধ্যমে নারীর ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত স্ক্রিন রেকর্ড করে সংরক্ষণ করে। পরে এসব ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে নারীর সঙ্গে একাধিকবার শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে। একইসঙ্গে ওই নারীকে ব্ল্যাকমেইল করে ৮ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয়। এরপর আরও অর্থ দাবি করলে ওই নারী তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। পরে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি ইমু অ্যাপে ভিকটিমের ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেয়। ঘটনার পর তিনি রাজধানীর রামপুরা থানা গত ২৩ জুন মামলা করেন। উক্ত পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন এর মামলাটি তদন্ত পূর্বক গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রাজধানীর মালিবাগে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃত শোয়াইব এর বাবার নাম বশির আহামদ। চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী থানার শিলকুপ ইউনিয়নের মনকি চর গ্রামে বলে জানা গেছে।
সিআইডি’র বিশেষ পুলিশ সুপার জসিম উদ্দিন জানান, এর আগে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের পর্নোগ্রাফি ভিডিও প্রস্তুত, সংরক্ষণ ও প্রচারের অভিযোগে এখলাছ আলী (৩০) নামে একজনকে গ্রেফতার করে সিআইডি। গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গী পূর্ব থানাধীন পাগার পাঠানপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি) জানতে পারে যে, বাংলাদেশের একজন নাগরিক অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের পর্নোগ্রাফি ভিডিও বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে তৈরি, সংরক্ষণ ও প্রচার করে আসছিলেন। সাইবার মনিটরিং টিম প্রযুক্তিগত সহায়তায় অভিযুক্তকে সনাক্ত করা হয়। এরপর তাকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি গাজীপুরের হোসেন ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং মিলস লিমিটেডে আইটি বিভাগের সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের পর্নোগ্রাফিক ভিডিও সংগ্রহ করতেন এবং তা মোবাইল ফোনে সংরক্ষণ ও প্রচার করতেন। তার কাছ থেকে একটি স্মার্টফোন জব্দ করা হয়, যার ভেতরে একাধিক শিশু পর্নোগ্রাফির ভিডিও উদ্ধার করা হয়।
মানসিক চিকিৎসকগণ বলছেন, টিকটক ও ফেসবুকে নারীর আসক্তি নানাভাবে ভয়াবহ পরিনতি ডেকে আনছে। যা নারীর মানসিক, শারীরিক, সামাজিক এবং পারিবারিক স্তরে গুরুতর প্রভাব ফেলছে। টিকটক ও ফেসবুকে অন্যের সাজানো গোছানো ও নিখুঁত জীবন দেখে নিজের জীবনের সাথে তুলনা করে নারী হতাশা ও উদ্বেগে ভুগছে। আর পোস্ট করা ছবি বা ভিডিওতে কাঙ্ক্ষিত লাইক-কমেন্ট না পেলে আত্মবিশ্বাস কমে যায় এবং দুশ্চিন্তা বাড়ছে। আবার আত্মবিশ্বাসের অভাব ও হীনম্মন্যতায় পড়ছেন। ফিল্টার ব্যবহার করে নিজেদের ত্রুটি লুকিয়ে সুন্দর ছবি পোস্ট করার প্রবণতা বাস্তবে নিজের চেহারা নিয়ে হীনম্মন্যতা সৃষ্টি করতে পারে। এতে বাস্তব জীবনের প্রতি অনীহা তৈরি হচ্ছে।
এসব নারী বা তরুনীরা অতিরিক্ত টিকটক ও ফেসবুক ব্যবহারের ফলে বাস্তবে মানুষের সাথে যোগাযোগ কমে যায়, যা একাকীত্ব বাড়ায় এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করছে। এদের রাতে অতিরিক্ত সময় ফেসবুকে ব্যয় করার কারণে ঘুমের চক্রে ব্যাঘাত ঘটে, যা দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অন্যদের কার্যকলাপ দেখে কিছু হারানোর ভয় বা “ফোমো” নারীর মধ্যে অস্থিরতা তৈরি করে, যা মানসিক চাপ বাড়ায়।
তাছাড়া শারীরিক সমস্যার মধ্যে স্থূলতা ও শারীরিক নিস্ক্রিয়তায় পড়ছেন। দীর্ঘক্ষণ বসে বা শুয়ে ফেসবুক ব্যবহারের ফলে ওজন বৃদ্ধি পেতে পারে এবং শারীরিক সক্রিয়তা কমে যেতে পারে। অতিরিক্ত সময় বসে থাকার কারণে মেরুদণ্ড ও পিঠে ব্যথা হতে পারে। শুধু তাই নয়, দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে চোখের উপর চাপ পড়ে এবং চোখের বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে।
অপরদিকে সম্পর্কের অবনতি হচ্ছে, অতিরিক্ত ফেসবুক ব্যবহারের কারণে পারিবারিক সদস্যদের সাথে সময় কাটানো কমে যায়। স্বামী-স্ত্রী, সন্তান বা পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে যোগাযোগ কমে আসায় সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। তাদের মধ্যে টিকটক ফেসবুকে নতুন সম্পর্ক তৈরি বা পুরানো সম্পর্কের সাথে মাত্রাতিরিক্ত যোগাযোগ দাম্পত্য জীবনে সন্দেহ ও অবিশ্বাস সৃষ্টি করতে পারে, যা বিবাহ বিচ্ছেদ পর্যন্ত গড়াতে পারে। অনেক জরিপে দেখা গেছে, ডিভোর্সের পেছনে ফেসবুকের ভূমিকা থাকে। এ নিয়ে ভার্চুয়াল জগতের জীবনকে বাস্তব জীবনে মানিয়ে নিতে না পারার কারণে শ্বশুর-শাশুড়ি বা স্বামীর সাথে মতের অমিল দেখা দিতে পারে, যা পারিবারিক কলহের কারণ হতে পারে।
সাইবার বুলিং ও হয়রানি: নারীরা ফেসবুকে প্রায়শই সাইবার বুলিং, আপত্তিকর মন্তব্য, হ্যাকিং, ব্ল্যাকমেইলিং এবং মিথ্যা তথ্যের শিকার হন। অনৈতিক সম্পর্ক ও প্রতারণা বাড়ছে। ফেসবুকের মাধ্যমে অপরিচিতদের সাথে সম্পর্ক গড়ে ওঠার সুযোগ থাকে, যা অনেক সময় অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে যেতে বা প্রতারিত হতে সাহায্য করে। এমনকি প্রেমের ফাঁদে ফেলে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ বা মানবপাচারের ঘটনাও শোনা যাচ্ছে। বিভিন্ন কারণে ফেক আইডি তৈরি করে নারীর সম্মানহানি করা, অশ্লীল ছবি বা ভিডিও ছড়ানো এবং অপপ্রচার চালানোর ঘটনা ঘটে। ফলে কর্মস্থলে বা পড়ালেখায় মনোযোগ কমে যায়। যার ফলে পেশাগত বা শিক্ষাগত জীবনে খারাপ প্রভাব পড়ছে। মূল্যবান সময় অকার্যকর ভিডিও দেখে বা ফেসবুক স্ক্রল করে নষ্ট হয়। যা ব্যক্তিগত ও পেশাগত উন্নয়নে বাধা দেয়। বাস্তবতা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ভার্চুয়াল জগতে অন্যের সাজানো জীবন দেখে বাস্তবতাকে ভুল বোঝা এবং মিথ্যা ও বিভ্রমের জগতে বসবাস করতে হচ্ছে। ফেসবুক ব্যবহারের ইতিবাচক দিক থাকলেও, যখন এটি আসক্তিতে পরিণত হয়। তখন তা নারীর জীবনে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনছে। এর থেকে মুক্তি পেতে সচেতনতা, সময় ব্যবস্থাপনার কৌশল অবলম্বন এবং প্রয়োজনে পেশাদারী সহায়তা গ্রহণ করা জরুরি বলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকগন জানিয়েছে।